জেলায় সার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। চতুর্দিকে কৃষকদের মাঝে শুধু হাহাকার। চাহিদার অর্ধেক সারও পাচ্ছে না কৃষকরা। কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সাথে বাস্তবের কোন মিল পাচ্ছে না সংশ্লিষ্টরা।
বরাদ্দের সার মিয়ানমারে পাচার হওয়ার কারণে উখিয়া, টেকনাফ এবং রামুতে ইউরিয়া সারের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য একটি চক্র মাঠে সার সংকটের বিষয়টি জিইয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে চলতি বোরো মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকার নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দাম দিয়েও বাজারে মিলছে না বিভিন্ন প্রকারের সার।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলছেন, শীঘ্রই সংকট কেটে যাবে। জেলায় চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হলেও ঘাটতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে ইউরিয়া সার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে কৃষকরা, যা দৃশ্যমান। শুধুমাত্র ইউরিয়া সার বাজারে না থাকার কারণে বোরো আবাদে বিপাকে পড়েছেন জেলার ৫ লক্ষাধিক কৃষক।
কৃষকদের দাবি, সারের বরাদ্দ কম থাকার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে একটি সিন্ডিকেট ও কালোবাজারি চক্র এই সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে। পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চল বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং মিয়ানমারেও কয়েকটি সিন্ডিকেট রাতের আঁধারে কক্সবাজার জেলার জন্য বরাদ্দকৃত সার উচ্চ দামে বিক্রি করে পাচার করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে উখিয়া এবং টেকনাফে কয়েকটি পয়েন্টে একশ্রেণীর প্রভাবশালী নেতারা মায়ানমারের ইউরিয়া সার পাচার করার কারণে এ সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক জানান, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় বোরো মওসুমে ৪ হাজার ৭৫ মেট্রিক টন সারের চাহিদার বিপরীতে সমসংখ্যক সার বরাদ্দ দেয়া হয়। শুধুমাত্র চলতি মৌসুমে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় ইউরিয়া সারের বরাদ্দ হয় ২ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন। টিএসপির বরাদ্দ ৪৭৫ টন। ডিএপি সারের বরাদ্দ হয় ৮৮৯ টন। এছাড়া এমওপি সারের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৩৬৮ টন। গত বুধবার পর্যন্ত গুদামে উক্ত চার প্রকার সারের মজুদ রয়েছে ১৭৮৭ টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী কক্সবাজার জেলায় কোন ধরনের সারের ঘাটতি নেই। তবে বাস্তবে মাঠে পাওয়া যাচ্ছে তার উল্টো চিত্র। রামুর গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়ায় সারের জন্য ডিলারের সাথে কৃষকদের হাতাহাতি এমনকি মারামারির পর্যায়ের ঘটনা ও ঘটেছে। উখিয়া এবং টেকনাফের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিনই মায়ানমারের পাচার হচ্ছে ইউরিয়া সার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে একাধিক চালান আটক হওয়ার পরেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কোন বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ চোখে না পড়ায় হতাশ কৃষকরা।
ঝিলংজা এবং পিএমখালীর কয়েকজন কৃষক জানান - ইউরিয়া সার বাজারে ২৭ টাকা কেজি সরকার নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা ৩০ থেকে ৩৩ টাকায় কেজি প্রতি কিনতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে ইউরিয়া সারের বস্তা ১৩৫০ টাকা হলেও তা বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায়। ডিএপি স্যারের কেজি প্রতি ২৭ টাকা দাম হলেও ২৭ টাকা দামে কোথাও এ সার বিক্রি করছেন না ডিলাররা। এমওপি সার বস্তা ১০০০ টাকা সরকার দাম নির্ধারণ করলেও ১২০০ টাকার নিচে কোথাও এসার বিক্রি হচ্ছে না। একইভাবে ডিএপি সারের দাম বস্তা ১০৫০ টাকা হলেও কৃষকদের কিনতে হচ্ছে ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকায়। বেশি দামেও অনেক এলাকায় সার পাচ্ছেনা কৃষকরা।
অপরদিকে বোরো আবাদে যথাসময়ে সার প্রয়োগ করতে না পারার কারণে চরম ক্ষতির মুখে পড়ছে কৃষকরা। রামু উপজেলার গর্জনিয়ার কৃষক আবুল কাশেম ও জসিম উদ্দিন জানান, উপযুক্ত সময়ে জমিতে সার দেওয়া জরুরি কিন্তু ডিলাররা বলছেন ৫ কেজি নাও। প্রয়োজনমতো সার দিতে না পারলে এবার ফলন অনেক কম হবে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সার মিলছে না ডিলারদের কাছেও। এ অবস্থায় তিনিসহ ওই এলাকার অনেক চাষি চরম দুশ্চিন্তায় আছেন।
চলতি মৌসুমে সারের সংকট এর কারণ খুঁজতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কৃষক এবং ডিলারদের সাথে কথা বলে জানা যায়- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্তৃক সারের চাহিদা নিরূপণ করতে গিয়ে প্রকৃত চাহিদা মাঠ থেকে তুলে আনেননা।
চাহিদা নিরূপণ করার সময় কর্মকর্তারা আউস, আমন বোরো মওসুম, শীতকালীন সবজির জন্য চাহিদা নিরূপণ করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে কক্সবাজারের রামু উপজেলায়সহ কয়েকটি উপজেলায় তামাক চাষ, মৎস্য ঘের, পানের বরজ, ছাদবাগান, বনবিভাগ কর্তৃক ফলজ ও বনজ গাছের বনায়নে সার প্রয়োগ করতে হয় তা হিসাবে আনেন না। ফলে চাহিদা নিরূপণের সময় ওই সারের চাহিদা পাঠানো হয়না কেন্দ্রীয়ভাবে। ফলে চাহিদা এবং বরাদ্দের মধ্যে বিস্তর অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অপ্রতুলতা, বিতরণ ব্যবস্থায় নেই কোন আধুনিকায়ন, মাঠে সারের জন্য গুজব সৃষ্টি করে মজুদের প্রবণতা, টেকনাফ উখিয়া রামুর চারটি সীমান্তে মোটা দাগে সার পাচারসহ নানা কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরদারির অভাব ও প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে চলতি মৌসুমে কৃষকদের কাছে সার পাওয়া আকাশ কুসুম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বর্তমান দায়িত্বগত ডিলারদের কাছ থেকে সরকারদলীয় নেতাদের কাছে ডিলারশিপ চলে যাবে -এমন গুজব সৃষ্টি করে সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে একশ্রেণীর দালাল চক্র। অনেকক্ষেত্রে কতিপয় ক্ষমতাধর নেতাদের দৌরাত্বের কারণে ডিলাররা বরাদ্দের বাইরে গিয়ে সার সংগ্রহ করছে না বলে জানা গেছে।
সারের সংকট, সমাধান ও বাস্তবচিত্র কেমন সে বিষয়ে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম জানান- জেলার বিভিন্ন উপজেলায় চট্টগ্রাম থেকে সার পরিবহণে বস্তাপ্রতি (৫০কেজি) ৬০ থেকে ১৪০ টাকা ব্যয় হয়। বিসিআইসি বাফার গুদাম করা গেলে বস্তা প্রতি ব্যয় ২০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে নেমে আসবে।চট্টগ্রাম সার কারখানা থেকে টেকনাফ উপজেলার দূরত্ব ২০০ কিলোমিটারের ও অধিক। কুতুবদিয়া উপজেলায় সার পরিবহনের ক্ষেত্রে ডিলারদের ৪ বার লোড আনলোড করতে হয়।পরিবহনের ব্যয়ের পাশাপাশি গুদাম ভাড়া, কর্মচারী বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক সুদসহ আনুসাঙ্গিক সকল প্রকারের খরচাদিও বেড়েছে। কিন্তু ডিলারদের এখনো ২০০৯ সালে নির্ধারিত কেজি প্রতি দুই টাকা কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। যে কারণে ডিলাররা প্রতিনিয়ত লোকসান গুণছেন। এমতাবস্থায় কক্সবাজার জেলায় দ্রুত বিসিআইসি বাফার গুদাম স্থাপন এবং দূরত্ব অনুযায়ী কমিশন নির্ধারণ করা না হলে ডিলারদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে।
খোঁজ নিয়ে খবর পাওয়া গেছে, ডিলারদের সার বিক্রি তদারকির জন্য উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একজন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হলেও ডিলার এবং সেই অফিসারের যোগসাজসে উচ্চ দামে কৃষকদের সার বিক্রি করা হলেও তারা কোন প্রতিবাদ জানাতে পারছে না। যার সুযোগ নিচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। ফলে ভর্তুকি দেওয়া কৃষকদের এই সার তাদের কিনতে হচ্ছে উচ্চ দামে। উচ্চ দাম কেন নেওয়া হচ্ছে তার প্রতিবাদ করতে গেলেই কৃষকদেরকে সার না দিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছেন ডিলাররা। ফলে কৃষকদের সাথে ডিলারদের একটা দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে প্রতিদিনই।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন, সারের ঘাটতি নেই। বাজার মনিটরিংয়ের জন্য টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। মিয়ানমারে কৌশলে সার পাচার বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন- উখিয়া এবং টেকনাফ উপজেলায় সার বিক্রি বিশেষ নজরদারি রয়েছে। প্রত্যেক ডিলারগণ বিক্রি শেষে রেজিস্টার এর মাধ্যমে অনলাইনের সার বিক্রির আপডেট প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী এ সার বিক্রি না করলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর ওই ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ও তিনি জানান।
দেশের অর্থনীতির প্রাণখ্যাত কৃষিকে রক্ষায় সারের বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ নিশ্চিতে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। সারের চোরাচালান বন্ধ ও সিন্ডিকেট করে অতিরিক্ত দাম আদায়ের বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান কৃষকরা।