মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
আমি পেশায় আইনজীবী, নেশায় কলাম লেখক। বিগত ৪৫ বছর ধরে বাদীপক্ষে বা আসামীর পক্ষে ফৌজদারী মামলা পরিচালনা করছি, ৩৫ বছর ধরে দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় ’অতিথি কলাম’ লিখছি। ১৯৮২ সালে ’দি এনোটেটেড আমস এক্ট’ নামে অস্ত্র আইনের একটি বই লিখেছিলাম। কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য নই, ভবিষ্যতে সদস্য হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষ থেকে ’অতিথি কলামে’ আমার ব্যক্তিগত মতামত ব্যক্ত করি। আমি সরকারী বা বেসরকারী কোন পদে নাই বিধায় আমার পদত্যাগ করার কোন সুযোগ নাই। কিন্তু প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ করার পর মর্মাহত হয়ে মনে হচ্ছে আমারও পদত্যাগ করা উচিত। আমি বিগত বেশ কয়েক মাস যাবত দৈনিক কক্সবাজারে লিখেছি দেশে মাদক পাচার,মাদক ব্যবসা বন্ধ করতে হলে অবশ্যই দেশের মধ্যে মাদকসেবন বন্ধ করতে হবে। কক্সবাজার মাঝের ঘাটের মসজিদের মুসল্লিরা নামাজের পরে মানববন্ধন ও মিছিল করে মাদক সেবন করা থেকে বিরত থাকার জন্য জনমত গঠনের উদ্যাগ নিয়েছেন। সকল মসজিদ কমিটিকে একই ধরনের মাদকবিরোধী প্রচার প্রচারণা চালানো উচিত । কেউ মাদকসেবন না করার সামাজিক দাবী অমান্য করে মাদকসেবন অব্যাহত রাখলে প্রশাসনে খবর দিয়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ঘটনাস্থলে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করে কারাগারে প্রেরণ করা হলে মাদকসেবন বন্ধ হয়ে যাবে। মাদক বিরোধী সাধারণ মানুষের যে কোন উদ্যোগকে প্রশাসন ও সরকারের সহযোগিতা করা উচিত। মাদক চোরাচালানী /আমদানী বন্ধ করতে হলে দেশের মধ্যে মাদকের চাহিদা তথা ব্যবহার অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। কেউ ইয়াবা বা মাদক সেবন না করলে মাদকের চাহিদা থাকবে না। ফলে ইয়াবা বা মাদক চোরাই পথে আমদানী সংক্রিয়ভাবে অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাবে। দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকা বা অনলাইনে প্রচার হওয়া অতিথি কলাম তিনি পড়েছেন কিনা বা পড়ে কোনভাবে প্রভাবিত হয়েছেন কিনা জানি না। ইশরাক হোসেন কারও জন্য অপেক্ষা না করে নিজের এলাকায় নিজের উদ্যোগে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন শুরু করার মত একটি অনুকরণীয় ভালো কাজ করতে গিয়ে অদৃশ্য চাপের কারণে তাঁর প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তেফা দিতে হল। ইশরাক হোসেন সরকারের প্রতিমন্ত্রী, নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছাড়াও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার গর্বিত সৎ,সাহসী সন্তান ও এ দেশের একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক। এ দেশের একজন সাধারণ নাগরিক কি কোন স্বভাব অপরাধী বা অপরাধ করতে প্রস্তুত কাউকে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ছাড়া ধৃত বা গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে পারেন? ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৯ ধারা অনুযায়ী তিনি তাঁর এলাকার চিহিৃত মাদকসেবনকারী, মাদক বিক্রেতাকে মাদক সেবন করতে বা বিক্রয় করতে প্রস্তুত অবস্থায় ধৃত করে পুলিশকে খবর দিয়ে ধৃত অপরাধীদের হস্তান্তর করতে অবশ্যই পারেন। ’ইশরাকের অভিযান চালানো সেই স্থানে যৌথ অভিযান’ শিরোনামে ২০ অক্টোবর প্রথমআলো পত্রিকার ২য় পৃষ্টায় প্রকাশিত সংবাদে লেখা হয়েছে, ’রাজধানীর দয়াগঞ্জ রেলক্রসিং সংলগ্ন গুমটিঘর এলাকায় মাদক স্পটে যৌথ অভিযান চালিয়ে দুই নারীসহ ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। পরে ভ্রাম্যমান আদালত তাদের প্রত্যেককে তিন মাসের কারাদন্ড দেন। এর পরের দিনও একই স্থান থেকে পুলিশ ৩জনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও অনেকে দেওয়াল টপকিয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছে বলে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এই স্পটেই গত শনিবার অস্ত্র উচিয়ে অভিযান চালিয়ে তীব্র সমালোচনার মূখে পড়েছিলেন সদ্য সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বার বার একজন প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য অনুরোধ করার পরও বোধগম্য বোঝাপড়ার কারণে অভিযান পরিচালনা না করায় ইশরাক হোসেন নিজের এলাকার লোকজন নিয়ে অভিযান পরিচালনা করে সঠিক কাজ করেছেন তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে পরের দিনের মাদকঅপরাধীদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার ও শাস্তি দেওয়ার ঘটনায়।
অস্ত্র হাতে নিয়ে তা প্রদর্শন করায় কি অস্ত্র আইনের বিধি বিধান লংঘন করা হয়েছে? সেই প্রশ্নের উত্তর হল, সরকার যে কোন নাগরিককে নিজের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র দখলে রাখার লাইসেন্স দিতে পারে। নাগরিককে লাইসেন্স পাওয়ার জন্য নির্ধারিত ফিস দিতে হয় এবং প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়ন করে অস্ত্র দখলে রাখার জন্য ট্যাক্স দিতে হয়। লাইসেন্সের অধীনে বৈধভাবে পিস্তল বা অস্ত্র ক্রয় করে তা পৈত্রিক সিন্দুকের ভিতর রেখে দেওয়ার জন্য নয়, প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য। অস্ত্র প্রদর্শন করে উদ্দেশ্যপূরণ হলে গুলি করার প্রয়োজন হয় না। ইশরাক হাতের অস্ত্র প্রদর্শন না করলে মাদকাসক্তরা/মাদক ব্যবসায়ীরা যদি গুলি করে ইশরাককে আহত বা নিহত করতো তখন কি সমালোচনা হতো? মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের পিতা, মাতা, স্ত্রী, সন্তানকে হত্যা করার খবর পত্রিকায় প্রায় সময় ছাপা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাদক পাচারকারীদের আক্রমণে আহত/নিহত হওয়ার সংবাদও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অভিজ্ঞতায় বলে যে বাড়ীতে লাইসেন্সধারী অস্ত্র আছে মর্মে সংবাদ প্রচার হয় সেই বাড়ীতে অবৈধ অস্ত্রধারী ডাকাতরা বৈধ অস্ত্রের ভয়ে ডাকাতি করতে যায় না। লাইসেন্সধারী অস্ত্র প্রদর্শন করেই যদি অপরাধী/প্রতিপক্ষ কাবু হয়ে যায় তখন গুলি করার আর প্রয়োজন হয় না। অস্ত্র প্রদর্শনের পর আক্রমাণকারী যদি ভয়ে তার অস্ত্র ফেলে দেয় তখন গুলি করে আক্রমণকারীকে আহত বা নিহত করলে তা আইন অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকারের সীমা লংঘিত হয়েছে বিবেচিত হবে ও আইনতঃ অপরাধ বলে গণ্য হবে। আইন দেশের কোন নাগরিককে কাপুরুষ হতে বলে না। যারা জনগণের অর্থে ক্রয় করা অস্ত্রভান্ডার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে তা সন্ত্রাসীদের লুট করার সুযোগ দিয়েছিলেন, যারা মাদক ব্যবসায় জড়িত,যারা মাদকব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়মিত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ আছে, তারাই ইশরাক হোসেনের সমালোচনা বেশী করছেন। অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল ’ম্যানস রিয়া’ বা উদ্দেশ্য। ইশরাকের অস্ত্র হাতে নেওয়ার কি খারাপ উদ্দেশ্য ছিল? সমালোচকরাও অভিযোগ করছেন না যে ইশরাক কারো বাড়ী,গাড়ী,জমি দখলের জন্য বা চাঁদাবাজীর উদ্দেশ্যে হাতে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন। শুধু সমালোচনা,গালাগালি,গলাবাজী,হুমকি-ধমকিতে জনগণের ও দেশের কোন উপকার হয় না। ইশরাক হোসেন কোন বেআইনী কাজ করেন নাই। তিনি কোন ভন্ডামীর আশ্রয় না নিয়ে নিজেই ঝুঁকি নিয়ে মাদকসেবী ক্রেতা ও মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ, ব্যতিক্রমধমীর্, বিরল ও অনুকরণীয় অভিযান পরিচালনা করে সততা,কর্তব্যনিষ্টা,দায়িত্বশীলতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন বিধায় তাকে প্রশংসা করে সম্মানিত করা উচিত বলে প্রকৃত মাদকবিরোধী আমজনতা মনে করেন।
১৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে ঢাকার ভাটারার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ আবাসিক এলাকার ’গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের তিনতলার বাড়ীতে অভিযান চালিয়ে ২৬জন নারীসহ ৮৫জনকে আটক করা হয়। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নারীদের ১৫দিন কারাদন্ড ৫০০ টাকা জরিমানা ও পুরুষদের এক মাস কারাদন্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। মাদকাসক্ত কিনা পরীক্ষা করা হয় নাই ও এদের মধ্যে একজন নির্দোষ বাদ্যযন্ত্র বাদক আছেন বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। এই রকম অভিযানে সামান্য ভুল হলে তার প্রতিকার চেয়ে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে আপিল করার বিধান আছে। রাজধানীর বার,ক্লাব ও তারকা হোটেলে ৪২টি অভিযান চালানো হলে সংশ্লিষ্ট মালিকরা নিষিদ্ধ মাদক ও বৈধ অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ এক নয় বলে মালিক সমিতির পক্ষে প্রতিবাদ করছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে মাদকসেবকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলে অবৈধ ও বৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের স্বার্থে আঘাত লাগছে। মাদক বিরোধী আমজনতা মনে করেন, দেশের সর্বত্র এই ধরনের অভিযান নিয়মিত চালিয়ে অবৈধ মাদকসেবনকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে হাতেনাতে ধরে ঘটনাস্থলে শাস্তি দিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালালে শাস্তির ভয়ে মাদকসেবন দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে এবং মাদকের চাহিদা না থাকলে দেশে মাদক পাচার,মাদক ব্যবসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।