কক্সবাজার শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বাঁকখালী নদী দখল ও দূষণমুক্ত করতে একে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে, এর সীমানায় থাকা সব দখলদারকে উচ্ছেদের নির্দেশও দেন আদালত।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রায়ের পুর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়। হাইকোর্ট তার পুর্ণাঙ্গ রায়ে ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, আগামী ৪ মাসের মধ্যে বাঁকখালী নদী ও এর আশপাশের এলাকাকে 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' হিসেবে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি, আরএস ও বিএস ম্যাপ অনুযায়ী এবং নদীর বর্তমান প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ ও পিলার স্থাপন করার নির্দেশ দেন।
এছাড়া, আগামী ৪ মাসের মধ্যে সব অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং নদীকে দূষণমুক্ত, নদীর দুই তীরে উজাড় হওয়া উপকূলীয় বন পুনরায় পুনরুদ্ধার বা বনায়ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত এই মামলাটিকে 'কন্টিনিউয়াস ম্যানডামাস' বা চলমান তদারকি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর ফলে নদী রক্ষায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো, তার অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রতি বছর জানুয়ারি এবং জুলাই মাসে (প্রতি ছয় মাস পরপর) নিয়মিতভাবে আদালতে জমা দিতে হবে বলা হয়েছে।
কলম্বিয়ার আত্রাতো ও পেরুর মারানিওন নদীর উদাহরণ টেনে আদালত মনে করিয়ে দেন– নদী শুধু একটি জলধারা নয়, এর নিজস্ব আইনি সত্তা ও অধিকার রয়েছে।
উল্লেখ্য, দখল থেকে বাঁকখালী নদীকে মুক্ত করে এর জৌলুস ফিরিয়ে আনতে ২০১৪ সালে প্রতিকার চেয়ে 'বেলা' হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। মামলাটি বানচাল করতে এর বিরুদ্ধে দখলকারীরা ২০২৩ সালে অপর একটি মামলা দায়ের করে, যা গত ২৪ আগস্ট খারিজ করে দেন আদালত।
ওইদিন হাইকোর্ট বাঁকখালী নদীর দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করে আগামী চার মাসের মধ্যে উচ্ছেদ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। সেই সঙ্গে ছয় মাসের মধ্যে নদীটিকে “প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ( ইসিএ)” হিসেবে ঘোষণা দিতে এবং সে মোতাবেক ব্যবস্থাপনা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
সে সময় হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল, বাঁকখালী নদীর বর্তমান প্রবাহ ও আরএস জরিপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করে সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়া, পূর্বে প্রদত্ত রুল চূড়ান্তকরণের মাধ্যমে নদী ও নদীসংলগ্ন এলাকাগুলো অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ইজারা প্রদান বন্ধ করতে হবে, পূর্বে দেওয়া সব ইজারা বাতিল করতে হবে, নদী এলাকার ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার করতে হবে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, দুই যুগ আগে সৃজিত প্যারাবন ধ্বংস করে প্রায় ৩০০ একর বনভূমিতে তৈরি হয়ে আধা পাকা চার শতাধিক ঘরবাড়ি। সব কটি বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগসহ নাগরিক সুবিধার সবকিছু ছিল। বাসাবাড়িতে ভাড়ায় থাকছেন ভাসমান মজুরশ্রেণির মানুষ।
কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ অভিযান চালিয়ে কস্তুরাঘাটের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জেলা প্রশাসন। তখন দখলমুক্ত করা হয় বাঁকখালী নদীর ৩০০ একরের বেশি প্যারাবনের জমি। কিন্তু কিছুদিনের মাথায় উচ্ছেদ করা ভূমিতে আবার নির্মিত হয় ঘরবাড়ি, দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা। অনেকে টিনের বেড়া দিয়ে জলাভূমি ঘিরে রাখে।
পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা বলেন, আড়াই বছর আগে নদীর ওপর প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৯৫ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখন থেকে ভূমিদস্যুদের নজর পড়ে সেতুর দুই পাশের প্যারাবনের দিকে। এ পর্যন্ত অন্তত ৬০০ একরের বেশি প্যারাবন ধ্বংস করে তাতে নির্মিত হয়েছে পাকা-সেমি পাকা ঘরবাড়ি, দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা। অথচ তিন দশক আগেও নদীর কস্তুরাঘাট ছিল শহরের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে উৎপত্তি হয়ে ৩৪ কিলোমিটারের নদীটি রামু ও কক্সবাজার সদর হয়ে শহরের কস্তুরাঘাট-নুনিয়াছটা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নুনিয়াছটা থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত ছয় কিলোমিটারে ১ হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়।
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, খুরুশকুলে যাতায়াতের জন্য নির্মিত সেতুর কারণেই নদীর মরণদশা যাচ্ছে। দখল-দূষণে নদীটি সংকুচিত হয়ে এখন (সেতুর গোড়ার অংশ) ২০০ ফুটের কাছাকাছি এসে ঠেকেছে। তাতে নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ বলেন, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর টানা দুই মাস প্যারাবনের উচ্ছেদ করা জায়গায় আবার ঘরবাড়ি নির্মাণের হিড়িক পড়ে। কিছুদিন ধরে শহরের টেকপাড়া, মাঝিরঘাট, হাঙরপাড়া, পেশকারপাড়া অংশের ভূমি দখল করে পাকা স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ ভুয়া কাগজ সৃজন করে নদীর জমি প্লট আকারে বিক্রি করছেন। তাতে কেউ বাধা দিচ্ছে না।
পরিবেশবিষয়ক বেসরকারি সংগঠন ‘সমৃদ্ধ কক্সবাজার’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, গত ১ বছরে কস্তুরাঘাট এলাকার দুই লাখের বেশি কেওড়াগাছ নিধন করে ৬০০ একরের প্যারাবন ধ্বংস করা হয়েছে। সেখানে রাতারাতি গড়ে উঠে সাত শতাধিক অবৈধ স্থাপনা। তাতে পাখির আবাসস্থল, মৎস্যসম্পদ-জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে।
গত বছরের ২৩ মে জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত হয় জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভা। তাতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান সারোয়ার মাহমুদ বিএস দাগ অনুসরণ করে নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, সীমানা নির্ধারণ এবং দখলদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ২০১৪ সালের তালিকায় দখলদার ছিল ৫১ জন। ২০২০ সালের দখলদারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩১ জনে।
পরিবেশবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এনভায়রনমেন্ট পিপলের প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, কস্তুরাঘাটের বদরমোকাম থেকে পেশকারপাড়া পর্যন্ত পাঁচটি দাগে নদী, খাল ও বালুচর শ্রেণির কয়েকশ একর সরকারি জমি দখল করে তাতে ১ হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।