মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় মারাত্মক উদ্বেগজনক খারাপ খবরের পাশে কয়েকটা ছোট ভালো খবরও প্রকাশিত হয়। ১০ সেপ্টেম্বর দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার প্রথম পৃষ্টায় ’টেকনাফে জেলে ছদ্মবেশে পাচারের সময় ১৪ লাখ ইয়াবাসহ আটক ২ ’ বড় শিরোনাম দিয়ে সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আমাদেরসময় পত্রিকার প্রথম পৃষ্টায় ’শিশুর শরীরও এখন ইয়াবা পাচারের বাহন’ শিরোনামে আরো মারাত্মক উদ্বেগজনক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার ২য় পৃষ্টায় ’ঈদগাঁওতে গাঁজা সেবনের দায়ে দুইজনের কারাদন্ড ও জরিমানা’ শিরোনামে এবং ১১ সেপ্টেম্বর পিছনের পৃষ্টায় ’কক্সবাজারে পুলিশের বিশেষ অভিযান ৫ ছিনতাইকারীসহ গ্রেপ্তার ২৩’ শিরোনামে প্রকাশিত আশা জাগানিয়া সংবাদে ১১জন মাদক সেবী, ৫জন ছিনতাইকারীসহ ২৩ জনকে এবং একইভাবে ১২ সেপ্টেম্বরের পত্রিকায় ৮ জন চোর-ছিনতাইকারী, ১২ জন মাদকসেবী, ৩ জন সাজাপ্রাপ্ত ও পরোয়ানাভুক্ত সহ মোট ২৫ জনকে কক্সবাজার মডেল থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছেন বলে সচিত্র খবর ছাপা হয়েছে। পুলিশের সক্রিয়তায় আমজনতা আশাবাদী হচ্ছেন।
সরকার মাদক পাচার, মাদক ব্যবসা বন্ধ করার লক্ষ্যে নতুন করে চেকপোস্ট স্থাপন,আইন পরিবর্তন করে শাস্তি অধিকতর কঠোর ও দ্রুত বিচার করে অপরাধীদের দন্ডিত করার জন্য আলাদা মাদক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা সহ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিলেও দেশে মাদক চোরাচালানী/আমদানী বন্ধ হয় নাই,বরং বেড়েছে প্রতীয়মান হয়। এক সাথে ১৪ লাখ ইয়াবা জব্দ করার খবর ইতিপূর্বে কোন দিন সংবাদপত্রে দেখা যায়নি। দিনের আলোয় জেলের ছদ্মবেশে নৌকাযোগে ইয়াবার বিশাল চালান পাচারের চেষ্টা করেছিলেন চোরাকারবারীরা। বাইরে থেকে নৌকাটি ছিল সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার নৌকার মতো। ভিতরে তল্লাশী চালিয়েও প্রথমে কোনো মাদক পাওয়া যায়নি। তবে নৌকার নিচে পানিতে দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ভাসছিল কয়েকটি বস্তা। সেই বস্তাগুলো খুলতেই বেরিয়ে আসে ১৪ লাখ পিস ইয়াবা। গত ৯ সেপ্টেম্বর টেকনাফ হৃীলা বিওপির সুইচগেইট সংলগ্ন এলাকায় দুপুর সাড়ে বারটার দিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অভিযান চালিয়ে এই ইয়াবা পাচারের সাথে সংশ্লিষ্ট ২জন আসামীও আটক করে প্রশংসিত হচ্ছেন। গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রামের আনোয়ারার তৈলার দ্বীপ সেতু এলাকায় র্যাব সদস্যরা একটি সিএনজি অটোরিক্সায় তল্লাশী চালিয়ে এক নারী এবং ৯বছর ও ১২বছর বয়স্ক দুই শিশুকে আটক করে শিশুদের পাকস্থলী থেকে ৬,৬১৫পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছেন। মাদক কারবারীদের কাছে এখন শিশুদের শরীরও হয়ে উঠেছে ইয়াবা পাচারের বাহন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে শিশুদের দিয়ে ছোট ছোট চালান বহন করানো হচ্ছে। এমনকি তাদের পাকস্থলীতে ইয়াবার প্যাকেট ঢুকিয়ে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পাঠানো হচ্ছে। বিনিময়ে দেওয়া হচ্ছে সামান্য টাকা কিংবা পরিবারের খরচ চালানোর প্রলোভন। এতে মরণনেশা ইয়াবা পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ বাহক হয়ে পড়েছে শিশু কিশোররা। উক্ত মামলার বিচারে শাস্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে ধৃত আসামীদের যারা কেবলমাত্র বাহক প্রতীয়মান হয়। মূল ব্যবসায়ীরা ধরাচোয়ার বাইরেই থেকে যাবে।
ইদানিং কক্সবাজার সহ দেশে বাসাবাড়ী,দোকান,স্থাপনার বিদ্যুতের সার্ভিস লাইনের তার চুরি হওয়া মহামারির আকার ধারন করেছে। চোরের হামলা থেকে মসজিদ,হাসপাতালও বাদ যাচ্ছে না। বড় বাজার মসজিদের মুসল্লিরা দ্বিতীয়বার মসজিদের তার চুরি করার সময় হাতে নাতে চোর ধৃত করতে সক্ষম হয়েছেন। ধৃত চোরদের রিমার্ন্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের চোরচক্রে আর কে কে আছে,তারা চোরাই তার ও অন্য মালামাল কাদের কাছে বিক্রী করে তাদের নামের তালিকা সংগ্রহ করে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করা হবে বলে ভুক্তভোগী জনগণ পুলিশের কাছে প্রত্যাশা করছেন। ধৃত চোরের কথাবার্তা শুনে ও চেহারা দেখে মনে হয় তারা মাদকাসক্ত। দেশের অধিকাংশ চুরি,ছিনতাই,রাহাজানি,সড়ক দুর্ঘটনা, ধর্ষণ,শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মত জঘন্য ঘটনায় মাদক বা মাদকাসক্তরাই জড়িত মর্মে সংবাদপত্রের দাবী অভিজ্ঞ মহল সমর্থন করেন। দেশে মাদকের চাহিদা থাকলে সরবরাহ বৈধ বা অবৈধ পথে তা অবশ্যই আসবে, এটা অর্থনীতির ধর্ম। অধিকন্তু মাদক ব্যবসায় ঝুঁকি থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যে কোটিপতি হওয়ার লোভে নতুন ব্যবসায়ী সৃষ্টি হচ্ছে।
এটা মৃত্যুর মত সত্য যে, মাদক চোরাচালানী/আমদানী বন্ধ করতে হলে দেশের মধ্যে মাদকের চাহিদা তথা ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কেউ ইয়াবা বা মাদক সেবন না করলে মাদকের চাহিদা থাকবে না। ফলে ইয়াবা বা মাদক চোরাই পথে আমদানী সংক্রিয়ভাবে অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাবে। ইয়াবা সেবনকারী বা মাদক সেবনকারীদের দ্রুত সনাক্ত করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষনিক শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতি জেলায়-উপজেলায় মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য সরকারীভাবে হাসপাতাল বা নিরাময়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু মাদক পাচারকারীদের ধরে বিশেষ আদালত গঠন করে মৃত্যুদন্ড,যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিলে ইয়াবা আমদানী বন্ধ হবে না। সরকারী/বেসরকারী চাকুরী,স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি,ড্রাইভিং লাইসেন্স,আমদানী রপ্তানীসহ ব্যবসায়িক লাইসেন্স বা পেশাজীবীদের সনদ প্রদানের সময়,কমিউনিটি পুলিশের সদস্য হওয়ার জন্য, রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যপদসহ নেতৃত্বের পদ দেওয়ার আগে ডোপ-টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করার সাথে মাদকাসক্ত নন মর্মে ডোপ-টেস্ট রির্পোট দাখিল করাও বাধ্যতামূলক করতে হবে। মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে তারা সর্বক্ষেত্রে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন মর্মে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে বাঁধা কোথায় ?
দেশের তরুণ সমাজ ঐতিহাসিকভাবে নেতা-নেত্রীদের অনুসরণ,অনুকরণ করে থাকেন। যে এলাকায় মাদকাসক্ত ব্যক্তি মেম্বার, চেয়ারম্যান,এমপি নির্বাচিত হন সে এলাকায় মাদকসেবীর সংখ্যা ও মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা দ্রুত গতিতে বেড়ে যায়। বিগত ১৭ বছরের ইতিহাস তার সাক্ষী। তাই ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে মাদকসেবন ও মাদক ব্যবসা কঠোরভাবে নিরুৎসাহীত ও বন্ধ করার লক্ষ্যে আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান/মেম্বার প্রার্থীদের যোগ্যতার একটি শর্ত হিসাবে মাদকাসক্ত নন মর্মে মনোনয়নপত্রের সাথে ডোপ-টেস্ট রিপোর্ট দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা হলে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের অতিরিক্ত কোন খরচ বৃদ্ধি পাবে না। কিন্তু গণতন্ত্র,আইনের শাসন ও দেশ-জাতির অনেক লাভ হবে।