হাজারো প্রাণক্ষয় আর ধ্বংসের পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান; দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি বুধবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
এর মাধ্যমে গত ৪০ দিন ধরে ইরানের ওপর চলা মার্কিন-ইসরায়েলের আক্রমণ স্থগিত হল, যা গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলকে ঠেলে দিয়েছিল একটি বৃহত্তর যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই যুদ্ধবিরতি এমন এক সময়ে এল, যখন উভয় পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং হুমকির ঘটনা ঘটছিল।
যুদ্ধবিরতি কার্যকরের মধ্য দিয়ে সেই শত্রুতার ‘অবসানের’ ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্ট বলেছেন, “উভয় পক্ষই অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা প্রদর্শন করেছে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গঠনমূলকভাবে যুক্ত রয়েছে।”
ইরান নিশ্চিত করেছে, এই দুই সপ্তাহের মেয়াদে তারা বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করতে দেবে। ইসরায়েলও ঘোষণা করেছে, তারা তাদের দীর্ঘদিনের শত্রুর ওপর হামলা বন্ধ রাখবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে এই পথে তেহরানের প্রতিবন্ধকতার কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়ে গিয়েছিল।
তবে যুদ্ধবিরতি নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ অবসানে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির বিষয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে এখনো বিস্তর ফারাক রয়েছে।
আগামী শুক্রবার ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনাই আসলে ঠিক করে দেবে, এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি একটি স্থায়ী চুক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে কি না।
যুক্তরাষ্ট্র কীসে সম্মত হয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে রাজি হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, তাদের সামরিক লক্ষ্যগুলো এরইমধ্যে ‘অর্জিত’ হয়েছে এবং ইরান হরমুজ প্রণালী ‘সম্পূর্ণ, তাৎক্ষণিক এবং নিরাপদভাবে’ খুলে দিতে রাজি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের কাছ থেকে ১০ দফা প্রস্তাব পেয়েছেন, যা আলোচনার জন্য একটি ‘কার্যকর ভিত্তি’ হিসেবে কাজ করছে।
ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, “অতীতের বিরোধপূর্ণ প্রায় সব পয়েন্টেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। এই দুই সপ্তাহের সময়কাল যুদ্ধবিরতির চুক্তিটি চূড়ান্ত ও কার্যকর করার সুযোগ দেবে।"
ট্রাম্প যে ১০-দফা পরিকল্পনার কথা বলেছেন তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা না হলেও আল জাজিরার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর জেমস বেস সেগুলোর ওপর আলো ফেলেছেন।
১. যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আগ্রাসন না চালানোর মৌলিক প্রতিশ্রুতি।
২. ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর এখন থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে।
৩. ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির স্বীকৃতি।
৪. ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা ও নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব প্রত্যাহার।
৫. আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় ইরানের বিরুদ্ধে থাকা সব প্রস্তাবের অবসান।
৬. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে থাকা সব প্রস্তাবের অবসান।
৭. উপসাগরীয় অঞ্চলের সব ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার।
৮. যুদ্ধের সময় ইরানের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ; যা হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী জাহাজগুলোর দেওয়া ফি থেকে পরিশোধ হবে।
৯. বিদেশে জব্দ করা ইরানের সব সম্পদ ও সম্পত্তি ফেরত দেওয়া।
১০. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি বাধ্যতামূলক রেজুলেশনের মাধ্যমে এসব বিষয় অনুমোদন।
তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যে কোনো শান্তি চুক্তিতে ইরানের পরমাণু মজুদের বিষয়ে ‘ব্যবস্থা’ নেওয়ার কথা থাকতে হবে।
“এটা পুরোপুরি দেখাশোনা করা হবে, না হলে আমি চুক্তিতে আসতাম না।"
ইরান অবশ্য দাবি করে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তারা পারমাণবিক কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করার বিষয়ে আলোচনায় আগ্রহী।
একই বিষয়ে স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানি কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে যে ১০-দফা পরিকল্পনা ফাঁস করেছেন, তা বর্তমানে আলোচনাধীন পয়েন্টগুলো থেকে ভিন্ন।
তিনি বলেন, "সেগুলো খুব ভালো পয়েন্ট এবং সেগুলোর বেশিরভাগই পুরোপুরি আলোচিত হয়েছে। তবে সেগুলো ততটা কঠোর নয়, যতটা ইরান দাবি করছে।”
যদি আলোচনা ফলপ্রসূ না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই আবার যুদ্ধে ফিরে যাবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন ট্রাম্প।
আল জাজিরা বলছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা তার প্রশাসন ১০ দফা পরিকল্পনার মূল বিষয়গুলো, যেমন- নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ ছেড়ে দেওয়া বা সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে কিছু বলেনি।
মজার বিষয় হল, হোয়াইট হাউজ ইরানের দূর পাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও এর সক্ষমতা নিয়েও কিছু বলেনি, যা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর তেহরানের পাল্টা হামলার প্রধান হাতিয়ার।
এর আগে ওয়াশিংটন দাবি করেছিল, ইরানকে তাদের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ বা সীমিত করতে হবে। কিন্তু ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার বিষয় নয়।
ইরান কীসে সম্মত হয়েছে?
চুক্তিতে সম্মত হওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের প্রধান শর্ত ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এক্সে লিখেছেন, “যদি ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ হয়, তবে আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী তাদের প্রতিরক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করবে।”
এরপরই বুধবার ইরাকের ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘শত্রু ঘাঁটিগুলোর’ ওপর তাদের হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দেয়।
আরাকচি ১৪ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ট্রাম্পের দাবিও নিশ্চিত করেন। তবে তার শর্ত, এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে।
সংবাদ সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিকল্পনায় ইরান ও ওমান উভয়কেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে ফি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার মতে, ইরানের সংগৃহীত এই অর্থ দেশটির পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করা হবে।
ইসরায়েল কীসে সম্মত হয়েছে?
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন করলেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এটি লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ বা দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের দাবির বিপরীত। শেহবাজ শরীফ বলেছিলেন, এই যুদ্ধবিরতির মধ্যে লেবাননের ওপর ইসরায়েলের হামলা বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।
বুধবার সকালেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে তেহরানপন্থি হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে পাল্টা হামলা শুরু করলে ২ মার্চ লেবানন এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
লেবানন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৪৯৭ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ৫৭ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন।
এরপর কী?
আল জাজিরা লিখেছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর পরবর্তী তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হল শুক্রবার ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু করা। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা ওই আলোচনায় বসবেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ বলেছেন, “আমি এই বিচক্ষণ পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই এবং উভয় দেশের নেতৃত্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি তাদের প্রতিনিধিদলকে ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি; যাতে সব বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো যায়।”
তবে ইরান বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পার্সি বলেন, “ট্রাম্পের শক্তি প্রয়োগের ব্যর্থতা মার্কিন সামরিক হুমকির গ্রহণযোগ্যতাকে কমিয়ে দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ওয়াশিংটন এখনও তর্জন-গর্জন করতে পারে, কিন্তু একটি ব্যর্থ যুদ্ধের পর সেই হুমকি এখন অন্তঃসারশূন্য। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থানে নেই। যে কোনো চুক্তিকে এখন প্রকৃত সমঝোতার ওপর ভিত্তি করে হতে হবে।”