উৎসব পাল
কক্সবাজার শুধু বাংলাদেশের একটি জেলা শহর নয়; এটি দেশের পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের প্রবেশদ্বার এবং বাংলাদেশের অন্যতম আন্তর্জাতিক পরিচয়। প্রতিবছর লাখো দেশি-বিদেশি পর্যটক এই শহরে আসেন। কিন্তু একটি শহরের পরিচয় শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার পরিচয় গড়ে ওঠে নাগরিক শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা, পরিকল্পিত অবকাঠামো এবং জনজীবনের মানের ওপরও।
দুঃখজনক হলেও সত্য, কক্সবাজার শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সরকারি স্থাপনার আশপাশ এবং জনবহুল এলাকায় অবাধে গরু ও ঘোড়ার বিচরণ আজ এক নিত্যদিনের দৃশ্য। জেলা সদর হাসপাতাল এলাকা, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এসব প্রাণী নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করে। কখনো তারা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো পথচারীর চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, আবার কখনো যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগ করে পরিবেশকে নোংরা করে তোলে।
একটি পর্যটন শহরের জন্য এটি কেবল একটি ছোটখাটো অসুবিধা নয়; এটি শহরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মতো একটি বড় সমস্যা।
একটি শহরকে যদি একটি মানুষের মুখের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে তার রাস্তা-ঘাট হলো সেই মুখের হাসি। আর সেই হাসির ওপর যদি ধুলাবালি, ময়লা ও বিশৃঙ্খলা জমে থাকে, তাহলে সবচেয়ে সুন্দর মুখও তার আকর্ষণ হারায়। কক্সবাজারের বর্তমান চিত্র যেন ঠিক তেমনই। প্রকৃতি তাকে অপরূপ সৌন্দর্য উপহার দিয়েছে, কিন্তু নাগরিক অব্যবস্থাপনা সেই সৌন্দর্যের আয়নায় একের পর এক দাগ টেনে দিচ্ছে।
বিশ্বের উন্নত পর্যটন শহরগুলোতে পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ, একজন পর্যটক কেবল সমুদ্র, পাহাড় বা দর্শনীয় স্থান দেখেন না; তিনি শহরের রাস্তাঘাট, পরিবেশ, মানুষের জীবনযাত্রা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাও পর্যবেক্ষণ করেন। একটি ছোট অব্যবস্থাপনাও পুরো শহর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।
অবাধে বিচরণকারী গবাদিপশুর কারণে শুধু সৌন্দর্য নষ্ট হয় না; জননিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। হঠাৎ রাস্তা পার হওয়া গরু বা ঘোড়ার কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিভিন্ন স্কুল কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, প্রাণীর বর্জ্য দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে, পরিবেশ দূষণ বাড়ায় এবং বিভিন্ন রোগজীবাণুর বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এসব প্রাণীর মালিক কারা? নিশ্চয়ই গরু, ঘোড়া নিজেরাই শহরে এসে ঘোরাফেরা করছে না। কোনো না কোনো মালিকের অবহেলা কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণেই তারা জনসাধারণের ব্যবহৃত সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিচরণ করছে। তাই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাইলে কেবল পশু সরিয়ে দিলেই হবে না; মালিকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
এ ক্ষেত্রে প্রশাসন, পৌরসভা, জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, অবাধে ঘোরাফেরা করা গবাদিপশু জব্দ করে নির্দিষ্ট স্থান কিংবা নির্দিষ্ট খোঁয়াড়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মালিকদের শনাক্ত করে অর্থদণ্ড ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে পুণরাবৃত্তি ঘটলে আরও কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে।
পাশাপাশি, পৌর কর্তৃপক্ষের উচিত নির্দিষ্ট এলাকায় গবাদিপশু পালনের নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো। সিসিটিভি নজরদারি, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং নাগরিক অভিযোগ গ্রহণের জন্য সহজ ব্যবস্থা চালু করা হলে সমস্যাটি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
পর্যটন নগর হিসেবে কক্সবাজারকে সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের শহরে রূপ দিতে হলে শুধু বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ছোট ছোট নাগরিক সমস্যারও কার্যকর সমাধান। কারণ, একটি বিশাল জাহাজ যেমন ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে ডুবে যেতে পারে, তেমনি একটি সুন্দর শহরের সুনামও ছোট ছোট অব্যবস্থাপনায় ম্লান হয়ে যেতে পারে।
কক্সবাজার আমাদের গর্ব, আমাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অন্যতম পরিচয়। তাই এই শহরের সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা শুধু প্রশাসনের নয়, নাগরিক ও গবাদিপশুর মালিক- সবারই নৈতিক দায়িত্ব।
আমরা চাই, কক্সবাজারের পরিচয় হোক তার নীল সমুদ্র, ঝাউবন, পরিচ্ছন্ন রাস্তা এবং সুশৃঙ্খল নগরজীবন দিয়ে-অবাধে বিচরণকারী গরু-ঘোড়া কিংবা অপরিকল্পিত নাগরিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নয়। একটি পর্যটন নগরের মর্যাদা রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। আজকের উদাসীনতা আগামী দিনের লজ্জায় পরিণত হওয়ার আগেই আমাদের সচেতন হতে হবে।