কক্সবাজারে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পর্যটক, ব্যবসায়ী ও শহরবাসি। ঈদের ছুটির মধ্যে গত এক সপ্তাহ ধরে দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। অনেক স্থানে লিফটে আটকে আতঙ্কিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে, আবার কোথাও এসি-ফ্যান ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অস্বস্তিতে কাটাতে হচ্ছে পর্যটকদের।
ব্যবসায়ীরা জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গিয়ে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। আর সাবস্টেশনের ১টি পাওয়ার ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ায় দৈনিক ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও প্রায় ৪ দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিভাগ।
ঈদের ছুটিতে পর্যটকে উপচে পড়ছে কক্সবাজার। দেশের অন্যতম এই পর্যটন নগরীর পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল এখন ভরে উঠেছে হাজার হাজার পর্যটকে। কিন্তু আনন্দঘন এই সময়েই বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে টানা লোডশেডিং।
গত এক সপ্তাহ ধরে হোটেল-মোটেল জোনে দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটকরা। গরমে অস্বস্তির পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক সেবাও। পর্যটকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে লিফটে আটকে আতঙ্কিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে, এসি-ফ্যান ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা অসহনীয় পরিস্থিতিতে কাটাতে হচ্ছে। এতে অনেকেই বাধ্য হয়ে কক্সবাজার ছেড়ে যাচ্ছেন।
নারায়ণগঞ্জ থেকে কক্সবাজারে ঘুরতে আসা পর্যটক মো. ইব্রাহিম বলেন, 'কক্সবাজারের মতো দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে এমন ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট অত্যন্ত হতাশাজনক। এই এলাকার সঙ্গে বিশাল একটি অর্থনৈতিক কাঠামো জড়িত। অথচ বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।'
তিনি জানান, কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় হোটেলের লিফটে তাঁর স্ত্রী, সন্তান, ভাইসহ আরও কয়েকজন আটকা পড়েন। তাদের সঙ্গে চারজন শিশুও ছিল। প্রায় ১০ থেকে ২০ মিনিট লিফটের ভেতরে আটকে থাকার কারণে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে অনেক চেষ্টার পর তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
মো. ইব্রাহিম বলেন, 'এ ধরনের পরিস্থিতি পর্যটকদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক এবং ভোগান্তিকর। পর্যটন নগরী কক্সবাজারে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন।'
ঢাকার ফকিরাপুর থেকে কক্সবাজারে ঘুরতে আসা পর্যটক রনি বলেন, 'কক্সবাজারে এসে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে। আমরা বাইরে ঘুরে হোটেলে ফেরার সময়ই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ থাকে না। রাতে কিছুটা সরবরাহ পাওয়া গেলেও তা পর্যাপ্ত নয়।'
তিনি বলেন, 'বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হোটেলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি)সহ অন্যান্য সেবাও স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। এতে করে পর্যটকদের আরামদায়ক অবস্থান ব্যাহত হচ্ছে এবং ভ্রমণের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে।'
ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ঘুরতে আসা পর্যটক ফায়াজ বলেন, 'গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান, এসি কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবাও ঠিকভাবে চালু রাখা সম্ভব হয়নি। গরমের মধ্যে আমাদের অনেকটা সময় লাইট-ফ্যান ছাড়াই থাকতে হয়েছে। জেনারেটর চালানো হলেও সেটি দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি চলেনি।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা আনন্দ করতে কক্সবাজারে এসেছি, কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আমার সঙ্গে আসা কয়েকজন বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হোটেলে থাকা অনেক পর্যটকও বিরক্ত হয়ে আগেভাগেই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আমাদের আরও দুই দিন থাকার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সেটি সম্ভব হচ্ছে না।'
এদিকে, লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক হোটেল-রিসোর্টে বাড়ছে জেনারেটর নির্ভরতা। এতে জ্বালানি খরচ বাড়লেও মিলছে না স্বস্তি। আর বুকিং বাতিল এবং আগেভাগে চেকআউটের কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছেন পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা।
হোটেল সী ক্রাউনের ম্যানেজার সাজ্জাদ হোসেন বলেন, 'ঈদের পর কক্সবাজারে পর্যটনের মৌসুম শুরু হয় এবং এ সময় বিপুল সংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটে। তাই আমরা সবাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবার প্রত্যাশা করি। কিন্তু বর্তমানে দিনের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎ না থাকায় অতিথিদের সেই সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।'
তিনি বলেন, 'জেনারেটরের মাধ্যমে কিছুটা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও এতে জ্বালানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে পূর্ণাঙ্গভাবে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।'
হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, 'ঈদের পরদিন থেকেই প্রতিদিন প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে হোটেল পরিচালনায় ব্যাপক চাপ পড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার মতো শুধু ডিজেল খরচ হচ্ছে।'
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অতিথিদের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেক পর্যটক জানিয়েছেন, দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে এমন লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি নেই। অথচ কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন এলাকা এবং ঈদের মৌসুমে এখানে বিপুল পর্যটকের সমাগম ঘটে।
ইয়াকুব আলী আরও বলেন, 'পর্যটকেরা এখানে আনন্দ উপভোগ করতে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে আমাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে এবং পর্যটন অভিজ্ঞতাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।'
কলাতলীস্থ শালিক রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক মো. সেজান বলেন, 'লোডশেডিং মানেই মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়া। কক্সবাজার একটি পর্যটন নগরী এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ আয়ের খাত, তাই এখানে সরকারের আরও বেশি নজরদারি থাকা প্রয়োজন।'
তিনি বলেন, বর্তমানে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। পর্যটক সমাগম বেশি থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যাপ্ত নয় বলে মনে হচ্ছে। দিনের বেলায় লোডশেডিং হলে তীব্র গরমে পর্যটকদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
সেজান আরও বলেন, 'বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক পর্যটকেরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। অনেক পর্যটকই ভিড়ের মধ্যেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চরম অস্বস্তি বোধ করছেন।'
কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, 'কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনের একটি বড় অংশ সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুৎনির্ভর। পর্যটকদের শতভাগ সেবা নিশ্চিত করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। কিন্তু চলমান লোডশেডিংয়ের কারণে একদিকে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, অন্যদিকে পর্যটকদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে, যা পর্যটক সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'অনেক সময় টানা আট থেকে নয় ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকছে। ফলে হোটেল পরিচালনায় জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি ব্যয় এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে আমাদের অর্জিত রাজস্বের প্রায় ৫০ শতাংশই জেনারেটরের ফুয়েল খরচে চলে যাচ্ছে।
মুকিম খান আরও বলেন, 'এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে হোটেল ও পর্যটন শিল্পকে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। তাই পর্যটন নগরী কক্সবাজারে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।'
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, 'বিদ্যুৎ সংকটের কারণে পর্যটন খাত অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্দিষ্ট করে টাকার অঙ্কে নিরূপণ করা হয়নি।'
তিনি বলেন, 'আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো-কক্সবাজারে বেড়াতে আসা সম্মানিত পর্যটকেরা চরম ভোগান্তি ও বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তাদের স্বাভাবিক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা ব্যাহত হয়েছে, যা পর্যটন শিল্পের জন্যও একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করে।'
তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, ঈদুল আজহার দিন ভোরে শহরের কলাতলীস্থ সাবস্টেশনের ১টি পাওয়ার ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ায় দৈনিক ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগতে পারে।
কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী বাবুল মিয়া বলেন, ঈদের দিন ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে কলাতলী সাবস্টেশনের একটি পাওয়ার ট্রান্সফরমার অভ্যন্তরীণ ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে যায়। ট্রান্সফরমারের ভেতরের কয়েলসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশে সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেটির মাধ্যমে আর বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, একটি পাওয়ার ট্রান্সফরমার বন্ধ হয়ে গেলে এর আওতাধীন বেশ কয়েকটি ফিডারে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঈদের দিন সকাল থেকেই বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ শুরু করেন। বিকল ট্রান্সফরমারের আওতাধীন ফিডারগুলোকে অন্য দুটি সাবস্টেশনের ট্রান্সফরমারের সঙ্গে জাম্পারিংয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত করে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখা হয়েছে।
বাবুল মিয়া জানান, প্রতিটি ট্রান্সফরমারের নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা রয়েছে। পুরোনো ট্রান্সফরমারগুলোকে অতিরিক্ত লোড দিলে সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রান্সফরমারগুলোকে তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতার নিচে রেখে পরিচালনা করা হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কিছু এলাকায় পর্যায়ক্রমে এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। একটি ফিডার বন্ধ রেখে পরে তা চালু করে অন্য ফিডারে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সমস্যা সমাধানে প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন। মেরামতের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই ট্রান্সফরমারের ত্রুটি সম্পূর্ণভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে।
কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, কক্সবাজার শহর ও হোটেল-মোটেল জোনে প্রতিদিন প্রায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও মিলছে ৪০ মেগাওয়াট।