‘বাক্কালি’ শব্দটি আঞ্চলিক, চট্টগ্রামের ভাষায় কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীকে অনেকেই ‘বাক্কালি’ নামে অভিহিত করে থাকেন। বাংলাদেশের পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চল বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে উৎপত্তি হওয়া এই নদীটি নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা ও কক্সবাজারের রামু উপজেলার বুক চিরে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ায় বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী চ্যানেলে গিয়ে মিশেছে।
প্রায় ৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর দুই তীর জুড়ে বিস্তৃত গ্রাম, কৃষকের সবুজ ক্ষেত আর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। প্রকৃতির এই অপরূপ ভুবন দীর্ঘদিন ধরে হেঁটে হেঁটে দেখেছেন কক্সবাজারেরই এক শিল্পী-কবি, গায়ক ও চিত্রশিল্পী ইয়াসির আরাফাত। বিশেষ করে করোনা মহামারির নিঃসঙ্গ সময়গুলোতে তিনি একা হাঁটতে হাঁটতে আবিষ্কার করেছেন নদীতীরের অজস্র জীবনের গল্প-নানা রঙের নাম জানা-অজানা ফুল, প্রকৃতির সূক্ষ্ম সৌন্দর্য, আর গ্রামীণ জীবনের সহজ দৃশ্য।
সেসব মুহূর্ত তিনি মোবাইল ক্যামেরায় বন্দি করেছিলেন। আর সেই ছবিগুলোই একসময় তার মনের অজান্তে রঙের তুলিতে রূপ নিতে শুরু করে। একের পর এক আঁকতে থাকেন তিনি-ফুল, প্রকৃতি, আর গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেই সৃষ্টিগুলো নিয়েই কক্সবাজার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজন করেন একক চিত্রপ্রদর্শনী-‘বাক্কালির ফুল ও অন্যান্য’। শুক্রবার বিকেলে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীটি শেষ হয় সোমবার।
প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে বড় আকারের একটি ব্যতিক্রমী চিত্র-‘ডেরা পরা মহিষ’। ছবিটিতে দেখা যায় কাদামাখা শরীরে একটি মহিষ নিশ্চিন্তে পড়ে আছে, চোখে এক ধরনের মায়াবী প্রশান্তি। তার চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে ৭-৮টি নাম না জানা বুনো ফুল। গ্রামীণ জীবনে মহিষের এভাবে কাদায় গড়াগড়ি খাওয়া খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য হলেও, শিল্পীর তুলিতে এটি পেয়েছে এক নতুন নান্দনিকতা ও গভীরতা।
এছাড়া প্রদর্শনীতে ছোট ছোট ক্যানভাসে উঠে এসেছে করলা, ঢেঁড়শ, ত্রিধারা, ডুল কলমি, অমরনীফুলসহ মোট ১২টি চিত্রকর্ম-যেখানে প্রকৃতির সূক্ষ্ম সৌন্দর্য ধরা পড়েছে অনন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে।
শিল্পী ইয়াসির আরাফাত জানান, করোনা সময়ে তোলা তার সংগ্রহে রয়েছে ১৭৩টি নাম জানা-অজানা ফুলের ছবি। কক্সবাজারের ডায়েরি শিরোনামে দুই মাস আগে চিত্রপ্রদর্শনী শেষ করার পর তিনি এসব ফুল আঁকার কাজে মনোনিবেশ করেন। একে একে সবগুলো ফুল ক্যানভাসে তুলে ধরার ইচ্ছা তার-বাংলার অজস্র ফুলকে সবার সামনে পরিচিত করে তোলাই তার লক্ষ্য।
কক্সবাজার শহরে জন্ম নেওয়া ইয়াসির আরাফাত দীর্ঘদিন ধরে কবিতা ও গল্প লিখে আসছেন। পাশাপাশি গান করেন, এবং ‘প্যানোয়া’ নামে একটি গানের দলের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তাদের একটি অ্যালবাম ‘এই রুহের তলে’ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখি ও সংগীতচর্চার পাশাপাশি ফাঁকে ফাঁকে আঁকেন ছবি-যেখানে তিনি খুঁজে ফেরেন প্রকৃতি, মানুষ আর জীবনের অন্তর্লীন সৌন্দর্য।