কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকত ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। এ সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, সৈকতের জোয়ার-ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত যেকোনো স্থাপনা নির্মাণ ও উন্নয়ন নিষিদ্ধ।
কিন্তু কে শুনে কার কথা? এই সমুদ্র সৈকতের তীর জুড়ে যেন গত কয়েক দশক ধরে চলছে দখলের মহোৎসব। যেখান থেকে রক্ষা পায়নি সৈকতের বালিয়াড়িও। যে বালিয়াড়ি দখল করে তৈরি করা ঝুপড়ি দোকান সমুহ অনেকটা বস্তিরূপে চিহ্নিত করেছিল সচেতন মহল। এসব অবৈধ দখল উচ্ছেদে উচ্চ আদালতের নিদের্শ কার্যকরের দাবিও ছিল পরিবেশবাদি সহ সচেতন মহলের।
যার প্রেক্ষিতে মার্চ মাসে কক্সবাজারে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ি দখল মুক্ত করার নিদের্শ দেন। এই নিদের্শের পর সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত ১২ মার্চ থেকে শুরু হয় উচ্ছেদ অভিযান। এ অভিযানের চার দিনে সহস্রাধিক অস্থায়ী দোকান ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করে বালিয়াড়ি দখল মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।
কিন্তু তিন মাস না পেরুতেই আবার সৈকত সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে ফিরেছে সকল ঝুপড়ি দোকান। অবৈধ দখলের কবলে আবারও বালিয়াড়ি হয়ে উঠেছে পুরানো বস্তিরূপে।
রবিবার সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের প্রবেশ মুখের দুই পাশের বালিয়াড়িতে দেখা মিলেছে এসব দোকানের। ত্রিপল, ভ্যানগাড়ি দিয়ে একটার সাথে একটা লাগানো হাজার ঝুপড়ি পুরোদমে চালু হয়েছে। কেউ শামুক-ঝিুনক, কেউ আচার, চা, পান। আবার কেউ কেউ নানা প্রসাদনীর দোকান সাজিয়ে বালিয়াড়ির পথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
সৈকতে প্রশাসনের নিয়োজিত এক বীচ কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঈদের আগের দুই রাতে সকল ঝুপড়ি দোকান বালিয়াড়িতে আবারও বসানো হয়েছে। ক্ষমতাসিন দলের কয়েকজন নেতার উপস্থিতিতে দখল করা হয়ে এ বালিয়াড়ি। বিষয়টি প্রশাসনকেও জানিয়েছেন তারা।
ঝুপড়ি দোকান পরিচালনাকারি কয়েকজন জানান, উচ্ছেদের পর তাদের বিকল্প কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। সৈকতে ব্যবসা করে গত দুই শতক পরিবার-পরিজনদের খচর মেটান তারা। ফলে ক্ষমতাসিন দলের নেতাদের একটা মাসোহারার বিনিময় আবারও দোকানগুলো বাসানো হয়েছে।
তবে কারা এই ক্ষমতাসিন দলের নেতা? তাদের নাম বলেননি কেউ। তবে দখলকারি ঝুপড়ি মালিকদের দেয়া তথ্য মতে, বালিয়াড়িতে বসানো এসব দোকানদারদের প্রতিটিতে নতুন করে দিতে হয়েছে ৬০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত।
শুরু সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ি না, তারও দক্ষিণে কলাতলী পয়েন্টের আগে বালিয়াড়িতে প্রকৃতভাবে সৃষ্ট গাঙলতা ঘিরেও দখল করে রেখেছে কেউ একজন। সৈকতের ডিভাইন সংলগ্ন সড়কের দুই পাশ দখল করে বসানো হয়েছে কাঁচা বাজার।
কক্সবাজারের পরিবেশবাদি সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) এর চেয়াম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক নতুন করে বালিয়াড়ি দখল করে বস্তি তৈরি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় এসব অবৈধ দখল রোধে বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। তা কোনভাবেই স্থায়ী থাকে না। এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিদের্শে বালিয়াড়ি দখল মুক্ত হয়ে প্রকৃতির রূপে ফিরে ছিল। এটা আবারও দখল খুবই দুঃখজনক। এটা দ্রুত উচ্ছেদ করে বালিয়াড়ি আগের রূপে ফিরে নেয়া জরুরি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, পর্যটন ব্যবসায়ীরা উচ্চ আদালতে একটি রীট আবেদন করেছেন। এর প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষে রীটের উত্তর প্রদান করা হবে। এ রীটের উত্তর প্রদানের পর আদালতে নিদের্শ মতে এসব দখলের বিষয়ে জেলা প্রশাসন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।