বরিশাল থেকে নিখোঁজের চার দিন পর কক্সবাজারে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্র সৌরভ দাশ শানকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। বুধবার রাতে কক্সবাজার পুলিশ তাকে তার মামা ও বরিশাল পুলিশের কাছে বুঝিয়ে দেয়। সৌরভের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকাশ থেকে টাকা তুলে খিচুড়ি কিনতে যাওয়ার পথে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি তার কাছে ঠিকানা জানতে চায়। ঠিকানা পড়তে যাওয়ার পরপরই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তারা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ জানায়- বরিশালের কালেক্টর স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সৌরভ দাশ শান-নিখোঁজের চার দিন পর মঙ্গলবার দিনগত রাত ২টার দিকে কক্সবাজারের একটি ব্রিজে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় তাকে। স্থানীয় দুই ব্যক্তি তাকে উদ্ধার করে ঈদগাঁও থানায় নিয়ে যান। বুধবার রাতে বরিশাল থেকে তার তিন মামা থানায় পৌঁছালে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
গত ২ মে মায়ের নির্দেশে বিকাশ থেকে টাকা তুলে খিচুড়ি কিনতে বের হয় সৌরভ। খাবারের অর্ডার দিয়ে রাস্তায় হাঁটার সময় এক অজ্ঞাত ব্যক্তি সাদা কাগজে লেখা একটি ঠিকানা পড়তে বলে। ঠিকানাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অচেতন হয়ে পড়ে সে।
সৌরভ দাশ শান বলেন, “আমি বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমে বিকাশ থেকে টাকা তুলি। এরপর আমাদের এলাকার একটি খিচুড়ির দোকানে অর্ডার দিয়ে সামনে হাঁটছিলাম। তখন একজন অচেনা ব্যক্তি আমার সামনে একটি কাগজ ধরে ঠিকানা পড়তে বলে। সেটি পড়ার পর থেকে আর কিছু মনে নেই।”
তিনি আরও বলেন, “এরপর যখন জ্ঞান ফেরে, দেখি আমি একটি ব্রিজের পাশে আছি। পরে এক নারী ও এক পুরুষ আমাকে দেখতে পেয়ে কথা বলেন এবং সেখান থেকে থানায় নেওয়া হয়। এখন মা-বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে, আমি ভালো আছি।”
এদিকে, সৌরভকে ফিরে পেয়ে স্বজনরা বরিশালবাসী ও প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তারা ঘটনার সুষ্ঠু ও গুরুত্বসহকারে তদন্ত দাবি করেছেন।
সৌরভ দাশ শানের মামা বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, বয়সের তুলনায় সৌরভের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, “সৌরভ ছোট ছেলে। তার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তাহলে অন্য শিশুদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি থাকতে পারে। সঠিক তদন্ত হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই-বরিশালবাসী, যারা বিষয়টি বেশি বেশি শেয়ার করেছেন, সাংবাদিক ভাইরা এবং পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে। তাদের সহযোগিতা ছাড়া সৌরভকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতো না। এই কয়েকদিন আমরা পরিবার হিসেবে খুব চাপ ও আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। এখন তাকে ফিরে পেয়েছি-এ জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”
আরেক মামা দীপ্ত কুমার ঘোষ বলেন, সৌরভকে খুঁজে পেতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বস্তরের সদস্যরা আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। র্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সবাই নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন এবং পরিবারকে সাহস জুগিয়েছেন। তিনি জানান, “এই কয়েকদিন আমাদের পরিবার ও বরিশালবাসী উদ্বেগে ছিল, এখন সৌরভকে ফিরে পেয়ে সবাই স্বস্তি ও আনন্দে আছে। বিশেষ করে কাউনিয়া থানার এসি, ওসি এবং মামলার আইও শহীদুল ভাইয়ের আন্তরিক সহযোগিতা আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাদের প্রচেষ্টাতেই আজ আমরা সৌরভকে ফিরে পেয়েছি।”
এই রহস্যঘেরা নিখোঁজের ঘটনায় বিস্মিত কক্সবাজার থানা পুলিশ। তাদের ভাষ্য, সৌরভের পকেটে থাকা বাসের টিকিট থেকে জানা গেছে, নিখোঁজ থাকার সময় সে দিনাজপুরের বিরামপুর এলাকাতেও ঘুরেছে। কীভাবে এবং কারা তাকে অচেতন করেছিল, তা তদন্তের পর জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঈদগাঁও থানার পরিদর্শক এটিএম শিফাতুল মাজদার জানান, বরিশালের কাউনিয়া থানা থেকে আসা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জিডির ভিত্তিতে উদ্ধার হওয়া শিশুটিকে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে কাউনিয়া থানার অধীনে তদন্তাধীন এবং কক্সবাজার জেলা পুলিশ সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।
তিনি আরও বলেন, শিশুটির কাছ থেকে ব্লু বার্ড ট্রাভেলসের ঢাকা-বিরামপুরগামী দুটি বাস টিকিট উদ্ধার করা হয়েছে। টিকিটে থাকা দুটি মোবাইল নম্বরের একটি বন্ধ পাওয়া গেছে, আরেকটি অসম্পূর্ণ। শিশুটিকে থানায় পৌঁছে দেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হবে এবং রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে।
বরিশালের ভাটিখানা গ্রামের সজল দাশ ও মিতু দাশের বড় ছেলে সৌরভ দাশ শান। তার বাবা বর্তমানে সৌদি আরবে প্রবাসে রয়েছেন।