কক্সবাজারের উখিয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে ছৈয়দা বেগম (৪৫) নামের এক নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১৬ মে) রাতে উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের টাইপালং গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নিহত ছৈয়দা বেগম ওই গ্রামের সাব্বির আহমদের স্ত্রী। একটি সাধারণ ফেসবুক ‘রিঅ্যাক্ট’কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত এক মায়ের প্রাণ কেড়ে নেওয়ায় পুরো এলাকায় শোক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনার প্রতিবাদে এবং বিচার দাবিতে রবিবার দিনভর উত্তেজনাপূর্ণ ছিলো টাইপালং এলাকা।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েক দিন আগে স্থানীয় টাইপালং মাদ্রাসার দেয়ালে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লেখাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতারা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কয়েকজনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেন। শনিবার সন্ধ্যায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের এক কর্মী ওই দেয়াললিখন নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিলে সেখানে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী মো. ইউনুস। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাতে বিএনপি ও ছাত্রদলের একদল নেতাকর্মী ইউনুসকে আটক করে মারধর শুরু করেন বলে অভিযোগে প্রকাশ। এ সময় ইউনুসকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান তাঁর বন্ধু ও স্থানীয় এনজিওকর্মী এস এম ইমরান। তখন ইমরানকেও বেধড়ক পেটানো হয়। খবর পেয়ে ছেলেকে বাঁচাতে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন মা ছৈয়দা বেগম। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, হামলাকারীরা এ সময় ছৈয়দা বেগমের ওপরও চড়াও হন। একপর্যায়ে তিনি ঘটনাস্থলে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাঁকে দ্রুত উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়, যেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের ছেলে এস এম ইমরান অভিযোগ করেন, স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাদের সরাসরি হামলায় তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিএনপি নেতা মিজান সিকদার, আব্দুল করিম, আকাশ, সাইফুল সিকদারসহ আরও বেশ কয়েকজন এই হামলায় অংশ নেন। হামলায় ইমরানের এসএসসি পরীক্ষার্থী বোন ও স্ত্রীসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। তবে অভিযুক্তরা এই দাবি অস্বীকার করেছেন। শনিবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে মিজান সিকদার ও আব্দুল করিম দাবি করেন, তাঁরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না এবং ওই নারী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বা অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশত তাঁদের এই ঘটনায় জড়ানো হচ্ছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুজিবুর রহমান জানান, ঘটনার পর পুলিশ ইউনুস নামের ওই যুবককে আটক করে থানায় নিয়ে এসেছে। ছৈয়দা বেগমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়ে ময়নাতদন্ত করারো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মরদেহে বড় ধরণের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া না গেলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে।
এদিকে রবিবার দুপুর আড়াইটায় টাইপালং এলাকায় বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে নিহতের জানাজার নামাজ সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে নিথর দেহটি পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার সময় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দাফন শেষে টাইপালং স্টেশন চত্বরে এক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে এনসিপি নেতা জিনিয়া শারমিন রিয়া ও স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, একজন মায়ের সন্তান বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারানোর ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করা হলে উখিয়া-টেকনাফ সড়ক অচল করে দেওয়ার ঘোষণা দেন তাঁরা।
উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী জানান, অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। যদি তদন্তে বিএনপির কেউ জড়িত প্রমাণিত হয়, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে জেলা জামায়াতের আমীর নুর আহমদ আনোয়ারী একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে টাইপালং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।