দুই বছর ধরে অচল থাকা হাজার কোটি টাকার মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম প্রকল্প অবশেষে চালুর পথে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই প্রকল্প চালু হলে মাত্র ৪৮ ঘন্টায় ১ লাখ মেট্রিক তেল গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনে আসবে মহেশখালীতে, সেখান থেকে পৌঁছে যাবে সারা দেশে। প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দ্রুত ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে এসপিএম কার্যক্রম চালু করা হবে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে খালি পড়ে আছে ৬টি স্টোরেজ ট্যাঙ্ক। এগুলোর মধ্যে ৩টি প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টন ক্রুড অয়েল ও বাকি ৩টিতে ৭৫ হাজার টন ডিজেল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে। অথচ নির্মাণের দুই বছরেও চালু করা যায়নি সিঙ্গেল পয়েন্ট মোরিং বা এসপিএম প্রকল্প।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। এ সময় ট্যাংক ফার্ম থেকে পাইপলাইন পর্যন্ত পুরো কার্যক্রম ঘুরে দেখেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৬ মাসের মধ্যেই এই প্রকল্প চালু হতে পারে বলে জানান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী।
তবে দুই বছর ধরে অচল থাকা এসপিএম প্রকল্পের দায় নিয়ে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, “দায় কার-এটা সবাই জানে। কিন্তু দায় দেওয়া-নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সমস্যার সমাধান খোঁজা।”
তিনি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স (ওএন্ডএম) ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাস করে মহেশখালী হয়ে সারা দেশে সরবরাহ ব্যবস্থাটি চালু করতে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মধ্যেই এসপিএম কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা সরেজমিন পরিদর্শন, কর্মকর্তাদের প্রস্তুতি যাচাই এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “প্রায় ৮ থেকে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প দুই বছর ধরে অচল থাকায় রাষ্ট্রের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। আমরা সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে চাই।”
প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি চালু করা গেলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন গতি আসবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে।”
প্রকল্পটি চালু হলে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় ১ লাখ টন তেল খালাস সম্ভব। এতে সময়, খরচ ও পরিবহনজনিত অপচয় কমবে। পাশাপাশি জরুরি সময়ে মজুত জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগও তৈরি হবে।
এ বিষয়ে পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মো. জিয়াউল হাসান বলেন, “সাধারণ পদ্ধতিতে গভীর সমুদ্র থেকে মাদার ভেসেল হয়ে তেল খালাস করতে ১১ থেকে ১২ দিন সময় লাগত। কিন্তু এসপিএম চালু হলে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তেল খালাস করা সম্ভব হবে।”
তিনি জানান, প্রকল্পে আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা থাকায় এখানে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি মজুদ করে রাখা যাবে, যা আপদকালীন পরিস্থিতিতে কৌশলগত রিজার্ভ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
জিয়াউল হাসান বলেন, “আমাদের তিনটি ক্রুড অয়েল ট্যাঙ্ক রয়েছে, প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৪২ হাজার মেট্রিক টন—মোট ১ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন। এছাড়া ডিজেল সংরক্ষণের জন্য রয়েছে ৭৫ হাজার মেট্রিক টনের সক্ষমতা। এই মজুদ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এসপিএম চালু হলে বছরে ৯০ লাখ টন জ্বালানি তেল খালাস ও পরিবহন সম্ভব হবে। যা থেকে সাশ্রয় হবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা।
এদিকে এসপিএম প্রকল্প এলাকার পরিদর্শন শেষে হোয়ানক ইউনিয়নে মোহড়া কাটায় অবস্থিত সিটিএমএস পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী। এসময় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ শরিফ হাসনাত, প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (উপসচিব) শহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।