কক্সবাজারের দ্বীপাঞ্চল মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টি, বৈরী আবহাওয়া এবং মারাত্মক রোগবালাইয়ের কারণে চিংড়ি চাষে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হঠাৎ পানির লবণাক্ততা ও তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়ায় ঘেরগুলোতে দেখা দিয়েছে পোনা ও মাছের ব্যাপক মড়ক। এতে হাজার হাজার একর জমিতে বিনিয়োগ করে কোটি কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়েছেন দুই উপজেলার বহু চাষি ও ঘেরমালিক।
সরেজমিনে জানা যায়, জমির অগ্রিম ইজারা (লাগিয়ত), বেড়িবাঁধ সংস্কার, শ্রমিক মজুরি এবং দেশের বিভিন্ন হ্যাচারি থেকে চড়া দামে পোনা সংগ্রহসহ প্রতিটি ধাপে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন চাষিরা। কিন্তু পোনা ছাড়ার পরপরই এবং অনেক ক্ষেত্রে মাছ কিছুটা বড় হওয়ার পর হঠাৎ তা মারা যেতে শুরু করে। মহেশখালীর এক চাষির দেওয়া তথ্যমতে, উপজেলায় প্রায় দেড়শ ঘেরে কয়েক কোটি পোনা ছাড়া হয়েছিল, যার ক্রয়মূল্য ছিল লাখ লাখ টাকা। টানা বৃষ্টিতে এসব পোনার সিংহভাগ মারা যাওয়ায় শুধু এ খাতেই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
চাষিদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সরকারি সহায়তার ঘাটতিই এই ক্ষতির প্রধান কারণ। ঘেরগুলোতে পানির লবণাক্ততা, পিএইচ ও দ্রবীভূত অক্সিজেন মাপার আধুনিক ব্যবস্থা নেই। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের কোনো পরীক্ষাগার না থাকায় প্রান্তিক চাষিরা চুন, লবণ ও বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করেও মড়ক ঠেকাতে পারেননি। পানি ও ঘের ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং মানহীন পোনার প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মহেশখালী উপজেলা ভূমি অফিসের তথ্যানুযায়ী, উপজেলায় মোট ৩ হাজার ৮৮৪ দশমিক ৬৭ একর চিংড়ি জমি রয়েছে। যার মধ্যে ২ হাজার ৭ ৯০ দশমিক ২৬ একর ইজারা দেওয়া এবং ১ হাজার ৬২ দশমিক ৪১ একর অননুমোদিত দখলে রয়েছে। জেলা মৎস্য দপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পুরো কক্সবাজারের আট উপজেলায় প্রায় ৬৫ হাজার একর জমিতে বাগদা চিংড়ি চাষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু চলতি মৌসুমের এই উৎপাদনে ধ্বস নামায় চাষিদের পাশাপাশি জমির মালিক, শ্রমিক, পোনা ব্যবসায়ী ও ওষুধ বিক্রেতাসহ পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা অবিলম্বে সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে- স্বচ্ছ জরিপের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের তালিকা তৈরি, সহজ শর্তে পুনর্বাসন ঋণ প্রদান, অধিক ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা, মৎস্য বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়ে রোগের বৈজ্ঞানিক কারণ শনাক্তকরণ এবং স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও স্লুইসগেট সংস্কার।
সার্বিক বিষয়ে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের বাস্তব অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উপকূলীয় টেকসই বাঁধ ও পানি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি। সেসব বিষয়ে ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলাপআলোচনা চলছে, আশা করি বাস্তবমুখী ফলাফল আসবে।
অভিজ্ঞদের মতে, শুধু সাময়িক আর্থিক সহায়তা নয়; বরং চাষিদের অধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করে তোলা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত আগাম সতর্কতা, ইউনিয়ন পর্যায়ে পানির গুণগত মান পরীক্ষার ও প্রতিকারের সরকারি উদ্যোগ এবং হ্যাচারিগুলোতে মানসম্পন্ন পোনা উৎপাদন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই শিল্পের স্থায়ী সুরক্ষা সম্ভব।