বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় যখন মেতেছে গোটা বিশ্ব, তখন কঙ্বাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও ছড়িয়ে পড়েছে ফুটবলের আবহ। বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে রোববার (২১ জুন) আয়োজিত এক প্রীতি ফুটবল ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছেন রোহিঙ্গা দল বনাম জাতিসংঘ, এনজিও এবং সরকারি সংস্থার প্রতিনিধি দল। আয়োজকরা বলছেন, খেলাধুলার মাধ্যমে সমপ্রীতি, সংহতি এবং শরণার্থীদের প্রতি সমর্থনের বার্তা পৌঁছে দিতেই এই আয়োজন।
বিশ্বকাপের উত্তেজনা এখন বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সেই আবহ পৌঁছে গেছে কঙ্বাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও।
কাঁদামাখা মাঠে দৌড়াচ্ছেন তরুণ খেলোয়াড়রা। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মাঝেও মাঠের বাইরে হাজারো উচ্ছ্বসিত দর্শক। অনেকে খেলা দেখতে অবস্থান নিয়েছে গাছের ডগায় কিংবা পাহাড়ের টিলায়। খেলার শুরু আগেই বেজে ওঠে গান, যে গানে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো ক্যাম্প। আর মধ্য বিরতিতে চলে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে শাকিরার গান ও রং ধোঁয়ার চৎমকার পরিবেশনা।
তবে এটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই প্রীতি ম্যাচ বহন করছে সংহতি ও সহমর্মিতার বার্তা। রোহিঙ্গা ফুটবলার বলছেন, স্বদেশে ফিরে নেইমার-মেসির মতো বিশ্বকাপে খেলতে চান তারা; এক্ষেত্রে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহযোগিতাও চান তারা।
রোহিঙ্গা দলের খেলোয়াড় কেফায়েত উল্লাহ বলেন, আমাদের ক্যাম্পেও অনেক ভালো ভালো খেলোয়াড় আছে। আমরা নিয়মিত অনুশীলন করি এবং বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখি। ইনশাআল্লাহ, একদিন নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারলে সেখানে আরও ভালোভাবে খেলাধুলা চালিয়ে যেতে চাই।
তিনি বলেন, আমরা স্বপ্ন দেখি ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে খেলার। মেসি, নেইমার, রোনালদো ও এমবাপ্পের মতো তারকা ফুটবলারদের দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই। সুযোগ ও সহায়তা পেলে আমরাও একদিন তাদের মতো বড় খেলোয়াড় হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
তিনি আরও বলেন, আমরা আশা করি শিগগিরই নিজ দেশে ফিরে যেতে পারব এবং সেখানে স্বাধীনভাবে খেলাধুলা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারব।
আরাকান রোহিঙ্গা ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মুজিবুর রহমান বলেন, আমরা সবসময় শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। খেলাধুলা আমাদের আনন্দ দেয়, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও নতুন করে আশা জাগায়। যখন আমরা মাঠে খেলি বা কোনো অর্জন করি, তখন আমাদের মনে অন্যরকম আনন্দ ও প্রশান্তি কাজ করে।
তিনি বলেন, এমন আয়োজন আমাদের জন্য অনেক উৎসাহব্যঞ্জক। তাই এই চমৎকার আয়োজনের জন্য আমরা জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর), শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন, এপিবিএন এবং সংশ্লিষ্ট সকল আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তাদের সহযোগিতা ও সমর্থন আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।
একদিকে ছিল রোহিঙ্গাদের দল, অন্যদিকে জাতিসংঘ, বিভিন্ন এনজিও এবং সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত দল। ৯০ মিনিটের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে রোহিঙ্গা দল ২-০ গোলে জয় তুলে নেয়। খেলা শেষে অতিথিরা বিজয়ী দলের খেলোয়াড়দের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন। তবে খেলার মাঠে সবাই প্রতিপক্ষ হলেও, বার্তা একটাই-শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানো।
জাতিসংঘ, এনজিও এবং সরকারি সংস্থার প্রতিনিধি দলের খেলোয়াড় ইসমাইল জাহেদ বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে একত্রিত হয়েছি। মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থা, ইউনিট ও অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে আমরা তাদের প্রতি আমাদের সংহতি জানাচ্ছি। আশা করি-রোহিঙ্গারা একদিন নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবে। তাদের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত হোক-এটাই আমাদের প্রত্যাশা। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে সেই প্রত্যাশা ও সংহতির বার্তাই তুলে ধরছি।
রোহিঙ্গা শরণার্থী দলের অধিনায়ক আফতাব হোসেন বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য হলো নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া। আমরা দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাস করছি, কিন্তু এ জীবন আমাদের স্থায়ী ঠিকানা নয়। একদিন না একদিন আমাদের নিজ দেশে ফিরতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা-রোহিঙ্গাদের যেন নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের সুযোগ করে দেওয়া হয়। আমরা চাই, নিজ দেশের মাটিতে ফিরে গিয়ে স্বাধীনভাবে খেলাধুলা করতে, আনন্দ-উল্লাস করতে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে।
এ বছরের বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ’। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখ রোহিঙ্গার অবস্থান করছে। তাদের অনেকের কাছেই ফুটবল শুধুই খেলা নয়, বরং সংকীর্ণ জীবনের মাঝে কিছুটা স্বস্তি, আনন্দ এবং স্বপ্ন দেখার সুযোগ।
বাংলাদেশস্থ ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বলেন, “প্রীতি ফুটবল ম্যাচে সরকারি প্রতিনিধি ও রোহিঙ্গা শরণার্থীরা একসঙ্গে অংশ নিয়েছেন। এটি শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়; বরং বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে সংহতি ও সহমর্মিতার একটি বিশেষ বার্তা বহন করছে।
তিনি বলেন, বিশ্ব শরণার্থী দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এ আয়োজনে মানবিক সহায়তা সংস্থা, ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠন, রোহিঙ্গা শরণার্থী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং সরকারি প্রতিনিধিরা একসঙ্গে অংশ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাই যে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে, তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ইভো ফ্রেইসেন আরও বলেন, শরণার্থীদের সর্বোচ্চ সহায়তা নিশ্চিত করতে সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের জন্য একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের আশাও ধরে রাখা হয়েছে।”
বিশ্বকাপে যেমন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও দেশের মানুষ একটি খেলায় একত্রিত হয়, তেমনি রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতেও প্রয়োজন বৈশ্বিক ঐক্য-বলছেন আয়োজকরা।
এপিবিএন (এফডিএমএন) ডিআইজি প্রলয় চিসিম বলেন, আমরা সবাই-বিশেষ করে সরকার, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো (এনজিও)-সমন্বিতভাবে কাজ করে এখানে একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হলো মানবিক কার্যক্রমগুলো যেন নির্বিঘ্নে পরিচালিত হতে পারে এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বেসামরিক (সিভিলিয়ান) চরিত্র অক্ষুণ্ন থাকে।
তিনি আরও বলেন, সবাই চায় ক্যাম্পগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকুক এবং কোনোভাবেই যেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অপরাধমূলক বা সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে।
মূলত এসব লক্ষ্য ও সচেতনতা সামনে রেখেই বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে এই ক্রীড়া আয়োজন করা হয়েছে।
মাঠে গোলের লড়াই চললেও বাস্তবতার লড়াই এখনও শেষ হয়নি। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় রয়েছে লাখো রোহিঙ্গা। তবে অন্তত এই একটি দিন, ফুটবল তাদের দিয়েছে আনন্দের উপলক্ষ আর বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছে একটি বার্তা-যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ, ততক্ষণ দায়িত্ব সবার।