জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলায় চলতি মৌসুমে বোরো ধানের ভালো ফলনে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে । ইতিমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জমির ধান পেকে গেছে। পাকা ধান কাটতে শুরু করেছেন কৃষকেরা। প্রাথমিকভাবে রামু, চকরিয়, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার কৃষকরা ধান কর্তন শুরু করেছে। তীব্র গরম উপেক্ষা করে নতুন ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ফলন ভালো হলে-ও বর্তমান বাজারের ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শংকায় আছেন কৃষকরা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বোরো মৌসুমে ধান, চাল ও গমের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ বছর ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান, ৪৯ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ চাল এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা কেজি দরে কিনবে সরকার। গত ২২ এপ্রিল সচিবালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভায় সরকারি এই দাম নির্ধারণ করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বোরো মৌসুমে আবাদি জমির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ হাজার ৭০০ হেক্টর। গেলো বছর ছিল ৫৫ হাজার ৬৯০ হেক্টর।বোরো মৌসুমে হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় তিন জাতের ফলনের আবাদ করেছেন কৃষকরা। ফলন আশা করা হচ্ছে, গড়ে ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। যা গত বছর ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। চাল উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭৫২ মেট্রিক টন। গত বছর ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৫ মেট্রিক টন। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ও নিবিড় পরিচর্চায় এ বছর ধানের ফলন খুব ভালো হয়েছে। ফলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছে দপ্তরটি।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, তীব্র তাপদাহের মাঠে ধান কাটছে কৃষকরা। কিছুক্ষণ পর পরেই পানি পান করছেন। কেউ কেউ মাঠ থেকে উঠে গাছের নিচে বসে বাতাস নিচ্ছেন। ধান কাটার জন্য বাইরে থেকে লোক আনা হয়েছে। প্রতিজনের মজুরি খরচ ১ হাজার টাকা। তবে ধানে সোনালী রঙ লাগলেও কৃষকের মুখ যেন মলিন। ডিজেল সংকটের কারনে সময়মত সেচ দিতে না পারায় বাড়তি খরচ গুনতে হয়েছে তাঁদের।
কৃষকরা জানিয়েছেন, 'আগামী দুই এক সপ্তাহের মধ্যে পুরোদমে বোরোধান কাটা শুরু হবে। বাকি দিনগুলোতে শিলাবৃষ্টি ও কাল বৈশাখীর ছোবল যদি কাটিয়ে উঠতে পারে তাহলে তাদের সোনার ফসল ঘরে তুলতে পারবেন তারা'।
পশ্চিম চাকমার কুল ৯ নং ওয়ার্ডে কৃষক ছগির আহমেদ বলেন, এবার ফলন আরো ভালো হওয়ার কথা ছিল। তবে সময়মতো বৃষ্টি হলে ফলন আরো ভালো হতো। তিনি বলেন, এবার লাভবান হতে পারবেন না। কারণ, ধান ঘরে তোলার সাথে সাথে ধানের দাম কমে যায়; এছাড়া এবারের আবাদ খরচ সবচেয়ে বেশি হয়েছে।
কাঁধে পাকা ধানের বোঝা নিয়ে যাওয়ার সময় হাসি মুখে হাফেজ আহমেদ বলেন, প্রতিবছরই ধান কাটার সময় রশিদ ভাই আমাদের আগে থেকে বলে রাখেন। কয়েক বছর ধরে আমরা তার ধান কর্তন করি। এবারও তার ধান কাটতে এসেছি ।
হাফেজ আহমেদ বলেন, ' ৬০ শতক জমিতে হাইব্রিড জাতের ধান রোপন করেছি। আলহামদুলিল্লাহ ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এবারের বোরো আবাদে সার, কীটনাশক ও সেচসহ সকল কৃষি উপকরণের মুল্য বেড়ে যাওয়ায় ধানের উৎপাদন খরচ বেশি হয়েছে। চাষিরা সরকার নির্ধারিত দাম কোন দিনই পায় না।' তাই তিনি ধানের দাম বাড়ানোর দাবি তুলেন।
সদর উপজেলা খরুলিয়া এলাকার জালাল আহমেদ বলেন, 'দুই কানি জমিতে ৭৫ জাতের বোরোধান লাগিয়েছি। আজ পর্যন্ত কোন সমস্যা হয়নি। প্রচন্ড গরমে ধানের পাতা লালচে রংয়ের হয়ে যায়। কীটনাশক ব্যবহার করেছি। ঠিকমতো পানি দিতে পারলে আর-ও সুন্দর ফলন হত। তিনি বলেন, জমির অগ্রিম বাবদ টাকা, পানির সেচ দিতে অতিরিক্ত টাকা, শ্রমিক খরচ, মেশিন ভাড়া, কীটনাশক, ইউরিয়াসহ যাবতীয় খরচ বাবদ ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ভালো হলেও খরচ নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
এদিকে প্রতি বছর কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার মেশিনে জমির ধান কর্তন করায় অনেক কৃষকদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসছে। তবে এবার জ্বালানি সংকটের অনেক হার্ভেস্টার বন্ধ ছিল। ফলে অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে ধান কাটার প্রস্তুতি নিতে কৃষকদের।
জানা যায়, জেলায় ৫৯ টি কম্বাইন হারভেস্টারের পাশাপাশি এলাকা ভেদে রিপার, ৯টি, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ৫৮ টি, পাওয়ার স্পেয়ার ১ টি, পাওয়ার থ্রেসার ১০৮ টি, বেড প্লান্টার ৭টি সিডার ৩২ টিসহ মোট ২৭৬ টি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী আশিষ কুমার দে জানান, 'জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বোরোধান কাটা শুরু হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আবাদও ভালো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে অতীতের এবারও বোরোধানের বাম্পার ফলন হবে'।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, জেলায় কৃষকের সংখ্যা ২ লক্ষ ৩৭ হাজার ৩১০ জন। এদের মধ্যে কেউ ক্ষেত করেন, কেউ ধানের আবাদ করেন আবার কেউ বিভিন্ন রকমের ফলনের আবাদ করেন। তিনি বলেন, গত শনিবার থেকে জেলার চকরিয়া, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের উপজেলায় কিছু কৃষক আগাম ধান কাটা শুরু করেছে। বৃষ্টি না হলেও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আশানুরূপ ফলন আশা করা হচ্ছে।