দীর্ঘ ১৮ বছর পর বুধবার (১৫ এপ্রিল) থেকে সারা ন্যায় কক্সবাজারে ও শুরু হয়েছে সরকারি প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশে পরীক্ষা শুরু হলেও প্রথম দিনেই উল্লেখযোগ্য হারে পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলার ১৮ কেন্দ্রে ১০ হাজার ৭৭৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিত ছিল ৬০২১ জন। অনুপস্থিত ছিল ৪৭৫৫ জন। উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির হার যথাক্রমে ৪৬ শতাংশ এবং ৪৪ শতাংশ। বিপুল সংখ্যক বৃত্তি পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতি ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্টদের।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: শাহীন মিয়া চৌধুরী বলছেন, যারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন তাদের পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল গতবছর ডিসেম্বরে। দীর্ঘ ৫ মাস পর বৃত্তি পরীক্ষার কারনে স্বাভাবিক ভাবে পরীক্ষায় অনুপস্থিতি বেড়েছে। তিনি শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও রমজানমাস জুড়ে মনিটরিং করায় উপস্থিতি অনেক বেড়েছে বলে দাবি করেন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, এবারের বৃত্তি পরীক্ষায় মোট ১০ হাজার ৭৭৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেওয়ার কথা ছিল কিন্তু প্রথম দিন উপস্থিত হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ২১জন। অনুপস্থিত ছিল ৪৭৫৫ জন। অনুপস্থিতির হার ৪৪ শতাংশ যা চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এদিকে জেলায় মোট ছাত্র পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪১৫৭ জনে উপস্থিত ছিল ২৩৬৮ জন। অনুপস্থিত ১৭৮৯ জন। ছাত্রী ৬৬১৯ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিল ৩৬৫৩ জন। অনুপস্থিত ছিল ২৯৬৬ জন।
গতকাল অনুষ্ঠিত বৃত্তি পরীক্ষায় উপজেলা ভিত্তিক অংশগ্রহণকারী, উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি বিশ্লেষণ করলে অনুপস্থিতির হার উদ্বেগজনক হিসাবে দাড়ায়। মহেশখালী ও এবং উখিয়া উপজেলায় উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতির হার বেশি। উপজেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যান হলো কক্সবাজার সদরে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন ১২৩৭ জনের মধ্যে ৭৪৬ জন। অনুপস্থিত ৪৯১ জন। রামুতে ১৩৪৩ জনে উপস্থিত ৬৫৩ জন, অনুপস্থিত ৬৯০ জন। ঈদগাওতে ৩৯৩ জনে ২৫৪ জন। অনুপস্থিত ১৩৯ জন।চকরিয়া ২০৩২ জনে ১২৮০ জন। অনুপস্থিত ৭৫২ জন।পেকুয়ায় ৯২০ জনে ৫১৩ জন, অনুপস্থিত ৪০৭ জন।কুতুবদিয়া ৭০০ জনে ৫৩১ জন, অনুপস্থিত ২৫৯ জন। মহেশখালীতে ১৩৭৪ জনে উপস্থিতি ৭৪৯ জন। অনুপস্থিত ৭১০ জন। উখিয়ায় ১৬০৮ জনে উপস্থিত ৭৪৯ জন, অনুপস্থিত ৮৫৯ জন। টেকনাফে ১১৬১ জনে উপস্থিত ৭৩১ জন, অনুপস্থিত ৪৩৮ জন পরীক্ষার্থী।
এদিকে, নির্ধারিত রুটিন অনুযায়ী গতকাল ১৫ এপ্রিল বাংলা, ১৬ এপ্রিল ইংরেজি, ১৭ এপ্রিল প্রাথমিক গণিত এবং ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় ও প্রাথমিক বিজ্ঞান পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত পরীক্ষা চলবে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘ বিরতির পর পরীক্ষা ঘিরে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হলেও অনুপস্থিতির হার বেশি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
৪৪ শতাংশ বৃত্তি পরীক্ষার্থী অনুপস্থিতি বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: শাহীন মিয়া চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর পর পরীক্ষা পুণরায় চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহের কমতি ছিল না। বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল গত বছর ডিসেম্বরে। সেটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে দীর্ঘ পাঁচ মাস পর এপ্রিলের মাঝামাঝিতে। বৃত্তি পরীক্ষায় যারা রেজিস্ট্রেশন করেছিল তারা ষষ্ঠ শ্রেণীতে অর্ধ বার্ষিকী পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেকে আবার বিভিন্ন উপজেলায় চলে গেছেন।দীর্ঘ বিরতির পর বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে আশংকাজনক হারে কমেছে পরীক্ষার্থী। আমার শিক্ষকগণ পুরো বছর জুড়ে এমনকি গেল রমজান মাসে ও বৃত্তি পরীক্ষার জন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করায় পরীক্ষার্থী অনেক বেড়েছে। অন্যথায় আরো কমার শংকা ছিল। এজন্য তিনি সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের প্রতি ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন- প্রথম দিনেই অনুপস্থিতির হার আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এর পেছনে আরো নানা কারণ থাকতে পারে প্রস্তুতির ঘাটতি, ভীতি কিংবা সচেতনতার অভাব। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।
কক্সবাজার বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া একাডেমি কেন্দ্রে অংশগ্রহনকারী পরীক্ষার্থীর অভিভাবক মোরশেদুল আলম খোকন জানান - ডিসেম্বরে বৃত্তি পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার হঠাৎ ঘোষণা দেন এ পরীক্ষা স্থগিতের। তখনই শিক্ষার্থীদের মনমানসিকতা ভেঙে পড়ে। সে প্রতিক্রিয়া থেকেই অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যায়। তারা ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ায় মনোনিবেশ করেছে। আবার হঠাৎ করে পরীক্ষা চালু হওয়ায় অনেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারেনি। এর ফলে অনুপস্থিতির হার বেড়েছে। সামনে এ ব্যপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
এদিকে পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জারি করা হয়েছে কঠোর আচরণবিধি। প্রবেশপত্র বাধ্যতামূলক, মোবাইল ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নির্ধারিত সময়ের আগে হল ত্যাগ করা যাবে না নকল, প্রশ্নপত্র বিনিময় বা অননুমোদিত সহায়তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নীতিমালা অনুযায়ী ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ—এই দুই ক্যাটাগরিতে বৃত্তি দেওয়া হবে। ছাত্র-ছাত্রী সমান হারে (৫০%-৫০%) বৃত্তি পাবে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ সরকারি ও ২০ শতাংশ বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষা ২০০৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী চালুর পর বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় চালু হওয়ায় শিক্ষাঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হলেও অনুপস্থিতির উচ্চ হার নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।