কক্সবাজারে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রবিবার (৫ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সরকারের পাইলট প্রকল্পের আওতায় হামের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে কক্সবাজারের রামু ও মহেশখালী উপজেলায় এবং কক্সবাজার শহরের একটি এলাকায় মোট ১ লাখ ২০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হবে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার সবসময় শিশু সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। কক্সবাজারে হামের প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হওয়ার পরপরই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে, আক্রান্ত এলাকায় সক্রিয় অনুসন্ধান, সংক্রমিত শিশুদের দুই ডোজ ভিটামিন-এ ক্যাপসুল প্রদান, টিকা বাদ পড়া শিশুদের হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা উন্নয়ন।
এছাড়া কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ইউনিসেফের সহযোগিতায় ৮ শয্যার হাম ওয়ার্ডকে ২০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে, যা দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি, কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীর, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান, ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠান শেষে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে শিশুদের টিকা প্রদানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হয়।
ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন জানান, প্রথম ধাপে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে মহেশখালীর ৫টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এবং রামুর ৪টি ইউনিয়নে এই টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রথম দিনে মহেশখালীতে ৪,২৩০ এবং রামুতে ২ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে, টিকা পেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। তারা জানান, হামের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এই উদ্যোগ তাদের স্বস্তি দিয়েছে।
১৩ মাস বয়সী শিশু সামিউল হকের পিতা সানাউল হক বলেন, হামের সংক্রমণ হওয়ার পর থেকে আমরা শঙ্কায় ছিলাম। এখন যেহেতু টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে তাই হাম থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে বলে মনে করছি। সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই।
৭ মাস বয়সী শিশু সাজ্জাদ ইসলাম সাগরের মা ফাহিমা রোকসানা শিউলি বলেন, কক্সবাজারের পাহাড়তলী থেকে টিকা দিতে আসছি আমার বাচ্চাকে। হাম রোগ হবে মনে করে খুব ভয়ে ছিলাম। এখন টিকা দিয়ে মনে হচ্ছে হাম রোগ আর হবে না। টিকা দিতে পেরে খুবই আনন্দিত আমি।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, কক্সবাজারে শনিবার একদিনেই হামে সংক্রমিত হয়ে নতুন ভর্তি হয়েছে ২৫ জন শিশু। বর্তমানে জেলা সদর হাসপাতালে রোগী ভর্তি আছে ৪২ জন। গত ২৪ ঘন্টায় রামু উপজেলার রাজিয়া নামে এক শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। জেলায় এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছেন। এরমধ্যে রামু উপজেলায় দুজন এবং মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও সদর উপজেলায় একজন করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছে ৭৫ শিশু। জেলায় গত ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ২৫ জন। গত এক সপ্তাহে জেলায় হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১৩২ জন।
এছাড়া পয়লা জানুয়ারি থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত জেলা সদর হাসপাতালে মোট ৯৩ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। জেলায় এই সময়ে হাম রুবেলায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৮৫ জন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, জেলার কয়েকটি এলাকায় সংক্রামক এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশী দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোন শিশু আক্রান্ত হয়নি। হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়া এলাকায় জরিপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ামোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জেলাজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব অনেকটা বেড়েছে। বিশেষ করে মহেশখালী, রামুর মিঠাছড়ি এবং কক্সবাজার শহরের কালুরদোকান, পাহাড়তলী ও রুমালিয়ারছড়া এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে পৃথক ‘আইসোলেশন ওয়ার্ড’ চালু করা হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের সেবায় সবধরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানান কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল আলম।
প্রাথমিকভাবে কক্সবাজার জেলার রামু ও মহেশখালী উপজেলায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হবে। তবে যাদের এ মুহূর্তে জ্বর আছে, তাদের সুস্থ হওয়ার পর টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।