রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থানীয় সরকার ও জনগণের মতামত উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ‘স্থায়ী অবকাঠামো’ নির্মাণের উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করে কক্সবাজার সীমান্তে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সুসংহত করার দাবি জানিয়েছে স্থানীয় এনজিও ও জনপ্রতিনিধিদের মোর্চা ‘কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম’ (সিসিএনএফ)।
সোমবার (১১ মে) সকালে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে "কক্সবাজারে বাংলাদেশে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রমে স্থানীয় সরকার ও জনগনের অংগ্রহণ জরুরি" শীর্ষক আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী ঘর নির্মাণ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ঝুঁকি এবং এটি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে চিরতরে বাধাগ্রস্ত করার একটি সুগভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা ও প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে দ্রুত একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন’ গঠন করার দাবি জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনটি পরিচালনা করেন সিসিএনএফ-এর কো-চেয়ারম্যান ও কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি তাঁর বক্তব্যে জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে বলেন, কক্সবাজার সীমান্তে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে সীমান্তে বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর টহলের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করতে হবে যাতে প্রতিবেশী দেশের কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আমাদের ওপর প্রভাব ফেলতে না পারে। তিনি আরও বলেন, “আসিয়ান ফোরামে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে এবং বাস্তবতার নিরিখে মিয়ানমারের আরাকান আর্মির সাথেও আলোচনার পথ খুঁজতে হবে।” কক্সবাজারের সমসাময়িক ইস্যুসহ জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জাতীয় সংসদে জোরালোভাবে উপস্থাপন করার জন্য তিনি কক্সবাজারের সংসদ সদস্যদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান।
সিসিএনএফ-এর সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করে বলেন, “ইউএনএইচসিআর স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই ব্র্যাক ও ইনফিনিক্সের মাধ্যমে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী কাঠামোর ঘর নির্মাণ করছে। এটি স্থানীয়দের মধ্যে চরম নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। সারা বিশ্বে শরণার্থীদের জন্য এমন স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের কোনো নজির নেই। প্লাস্টিক ও পরিবেশ-বিঘ্নিত উপকরণের এই ঘরগুলো মূলত রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে রাখার একটি পাঁয়তারা, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরণের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করবে।”
তহবিল বঞ্চনা ও স্থানীয় এনজিওদের উপেক্ষার চিত্র তুলে ধরে সিসিএনএফ সদস্য মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় ইউএনওসিএইচএ প্রদত্ত ১৫০ মিলিয়ন ডলার তহবিলের ৯২ শতাংশই জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কবজা করে রেখেছে। স্থানীয় এনজিওদের জন্য মাত্র ৮ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ‘স্থানীয়করণ’ প্রতিশ্রুতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আমরা দাবি জানাই, মহান সংসদে এমন আইন করা হোক যাতে স্থানীয় এনজিওদের বাদ দিয়ে জাতিসংঘের কোনো সংস্থা এককভাবে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারে।” পাশাপাশি তিনি জেআরপি ব্যবস্থাকে স্থানীয় এনজিওর জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, ব্র্যাক স্থানীয় এনজিওদের জন্য যে পুল ফান্ড পরিচালনা করছে, তাতে মাত্র ২২ শতাংশ স্থানীয় এবং ৭৮ শতাংশ জাতীয় এনজিও তহবিল পাচ্ছে। এটি স্থানীয় এনজিওর স্বার্থের পরিপন্থী। তিনি আরও বলেন, “কক্সবাজারে কর্মরত অনেক আইএনজিও ও জাতিসংঘ সংস্থায় নীতিনির্ধারণী পদে একটি নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের আধিক্য আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের। তারা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে প্রভাব খাটাতে পারে। তাই এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে অবিলম্বে বাংলাদেশি ও কক্সবাজারের যোগ্য সন্তানদের নিয়োগ দিতে হবে।”
পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে সিইএইচআরডিএফ-এর প্রধান নির্বাহী ও পরিবেশ আন্দোলন কর্মী মো. ইলিয়াস মিয়া বলেন, “রোহিঙ্গাদের কারণে ইতোমধ্যে ৮০০০ একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে, যার ফলে কক্সবাজারের পরিবেশ ও ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। অবিলম্বে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধ করে নাফ নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহ এবং নতুন করে পুকুর খননের উদ্যোগ নিতে হবে।”
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক তানজির উদ্দিন রনি রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন টিমে (আরসিটি) স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, “স্থানীয় সরকার ও জনগণের প্রতিনিধি ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কোনো সিদ্ধান্তই টেকসই হবে না। প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় জেলাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাই একটি পৃথক ‘প্রত্যাবাসন কমিশন’ গঠন এখন অপরিহার্য।”
কম্বাইন হিউম্যান রাইটস ওয়ার্ল্ড-এর প্রতিনিধি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হাসান বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) কর্তৃক রোহিঙ্গাদের ‘ভেন্ডরশিপ’ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে উদ্বেগজনক হিসেবে অভিহিত করেন। রাজাপালং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ক্যাম্পের বর্জ্যে আমাদের ৩০০ একর আবাদি জমি আজ চাষ অযোগ্য। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে যার ভয়াবহ প্রভাব আগামী ১০ বছরে পরিলক্ষিত হবে। অথচ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো স্থানীয়দের এই আর্তনাদ উপেক্ষা করছে।”
সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে রেজাউল করিম চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন, আমরা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কোন ধরনের অগ্রগতি দেখি না। এমনকি এই বিষয়ে কি আলোচনা হচ্ছে, কি সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তা আমাদেরকে জানানো হয়না। আমরা প্রত্যাবাসন বিষয়ে কোন রোড ম্যাপ দেখিনা। তিনি বলেন, উখিয়া টেকনাফ সীমান্তে কোন ধরনের নিরাপত্তা নেই, বিজিবি শক্তিশালী নয়, প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ২০১৪ সালে আমরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানিয়েছি যে বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। সেনাবাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো দরকার। কিন্তু এইবিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বিষয়ক কোন জাতীয় পলিসি কিংবা পরিকল্পনা নেই। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গতবছর সেপ্টেম্বর ড. ইউনুসের প্রচেষ্ঠার জেনেভায় রোহিঙ্গা বিষয়ক একটি কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়েছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় এই বিষয়ে কোন কাজ করছে কিনা আমরা সন্ধিহান।