কক্সবাজারের দরিয়ানগরে অবস্থিত চট্টগ্রাম ভেটেনারী ও প্রাণী বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ে কালভার্ট নির্মাণের জন্য মাটি কাটছিলেন ১৩ শ্রমিক। ঈদের ছুটির পর কাজে যোগ দেওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায় ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
বৃহস্পতিবার (০৪ জুন) দুপুরে হঠাৎ মাটি ধসে চাপা পড়েন তিন শ্রমিক। সহকর্মীরা দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও দুই শ্রমিকের প্রাণ রক্ষা হয়নি। গুরুতর আহত আরেক শ্রমিককে পাঠানো হয়েছে চট্টগ্রামে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটার কারণেই ঘটেছে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
শ্রমিকরা জানায়, পাহাড়ি এলাকায় পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে গত দুই মাস ধরে চলছিল ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণের কাজ। ঈদের ছুটির কারণে কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর সোমবার আবারও কাজে ফেরেন শ্রমিকরা। মোট ১৩ জন শ্রমিক কাজ করলেও মাটি কাটার কাজে নিয়োজিত ছিলেন তিনজন। দুপুরের দিকে হঠাৎ মাটি ধসে চাপা পড়ে যান তারা। সহকর্মীদের চিৎকারে অন্য শ্রমিকরা ছুটে এসে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। পরে মাটিচাপা অবস্থায় তিন শ্রমিককে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে দুইজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত একজনকে পাঠানো হয়েছে চট্টগ্রামে।
নিহত ২ শ্রমিক হলেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার জাফর আহমেদের ছেলে মোহাম্মদ ইলিয়াস ও একই উপজেলার নাসির আহমেদের ছেলে মোহাম্মদ রাকিব।
আহত শ্রমিক মোহাম্মদ শাহজাহান একই উপজেলার বাসিন্দা।
প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক মোহাম্মদ রিদুয়ান বলেন, “ঈদের আগে ৬দিন কাজ করেছি। এরপর ঈদের ছুটি আমরা নিজ বাড়ি বাঁশখালী গিয়েছিলাম। পরে ঈদের ছুটি কাটিয়ে এসে গত সোমবার থেকে কাজ শুরু করি। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আমরা বিভিন্ন জায়গায় ভাগ হয়ে কাজ করছিলাম। কেউ মাটি কাটছিল, কেউ সেই মাটি সরিয়ে অন্যত্র ফেলছিল। হঠাৎ দেখি একপাশের মাটি ধসে পড়ে কয়েকজন শ্রমিক চাপা পড়ে গেছেন। তখন আমরা দ্রুত চিৎকার করে সবাইকে ডাকি। আশপাশের লোকজনও ছুটে আসেন। পরে সবাই মিলে মাটি সরিয়ে তাদের উদ্ধার করি এবং দ্রুত হাসপাতালে পাঠাই।”
শ্রমিক মোহাম্মদ হামিদ বলেন, “কাজ করার সময় হঠাৎ ওপর থেকে মাটি ধসে পড়ে। তখন আমরা কয়েকজন একটু দূরে ছিলাম। যারা মাটি কাটার কাজ করছিলেন, তাদের তিনজন মাটিচাপা পড়েন। ঘটনাস্থলের আশপাশে আমরা আরও ১০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। আমরা দ্রুত এসে মাটির নিচ থেকে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।”
এদিকে, পানি চলাচলের ছড়ার ওপর ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণকাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লাকি এন্টারপ্রাইজ। গত দুই মাস ধরে প্রকল্পটির কাজ চলছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, পাহাড় ধস নয়, কালভার্ট নির্মাণের জন্য মাটি কাটার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও প্রাণী বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ইমাম হোসেন বলেন, “এখানে মূলত একটি পুরোনো লোহার ছাকুনি (কালভার্ট কাঠামো) পরিবর্তন করে নতুন কালভার্ট নির্মাণের কাজ চলছিল। এটি কোনো পাহাড় কাটার কাজ নয়। কালভার্ট নির্মাণের জন্য মাটি খননের সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। খবর পেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন দ্রুত আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কাজটি ঠিকাদারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল।”
লাকি এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার আব্দুর রহমান মজুমদার বলেন, “সড়কের নিচে থাকা পুরোনো কালভার্টের পরিবর্তে নতুন একটি কালভার্ট নির্মাণের কাজ চলছিল। এ প্রকল্পের জন্য নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজটি আমাদের প্রতিষ্ঠান পেয়েছে। নির্মাণকাজে স্থানীয় এলাকার শ্রমিকরাই নিয়োজিত ছিলেন। কাজ চলাকালে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।”
মাটি ধসের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ। তবে তারা পৌঁছানোর আগেই শ্রমিক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ফায়ার সার্ভিস জানায়, অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, “দরিয়ানগর এলাকায় একটি কালভার্ট নির্মাণকাজ চলছিল। কাজের একপর্যায়ে মাটি ধসে তিন শ্রমিক মাটির নিচে চাপা পড়েন। পরে ঘটনাস্থলে থাকা অন্য শ্রমিকরা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, কালভার্টের জন্য মাটি কাটার সময় ওপরের অংশ থেকে মাটি ধসে পড়ে শ্রমিকদের ওপর, ফলে তারা মাটিচাপা পড়েন। অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটার কারণেই ঘটেছে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।