দেশের ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেটের চাহিদা মেটাতে এবং তথ্যের মহাসড়কে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে কক্সবাজারেই স্থাপিত হচ্ছে দেশের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল 'সি-মি-উই ৬' (SEA-ME-WE-6)। ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের সাবমেরিন ক্যাবল লাইনের ভৌত স্থাপন কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে ডাটা সেন্টারের যন্ত্রাংশ বসানো ও কমিশনিংয়ের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও, আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই নতুন ক্যাবলটি বাণিজ্যিকভাবে চালু করা সম্ভব হবে।
শনিবার (২৩ মে) কক্সবাজার সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনের ২০ বছর পূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।
২০০৬ সালের ২১ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কক্সবাজারের এই ল্যান্ডিং স্টেশনটি উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশকে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক 'ইনফরমেশন সুপার হাইওয়ে'-এর সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনের উপ-মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোঃ তারিকুল ইসলাম পিইঞ্জ বলেন, 'কক্সবাজার ও কুয়াকাটা ল্যান্ডিং স্টেশনের বর্তমান সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৯,৪০০ জিবিপিএস, যার মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে ৪,১০০ জিবিপিএস। এখনো অর্ধেকেরও বেশি সক্ষমতা উদ্বৃত্ত রয়েছে। এর মধ্যেই কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনে আমাদের নিজস্ব অংশের নতুন সাবমেরিন ক্যাবল (সি-মি-উই ৬) টানার কাজ শেষ হয়েছে। এখন যন্ত্রপাতি বসানোর কাজ চলছে।'
তিনি আরও জানান, আগে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি চালুর লক্ষ্য থাকলেও বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে কিছুটা সময় লাগছে। তবে ২০২৭ সালের মধ্যে এই ক্যাবলটি পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে চালু হবে। এটি চালু হলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত আরও প্রায় ৩০ হাজার জিবিপিএস সক্ষমতা অর্জন করবে। ফলে রাষ্ট্রীয় সাবমেরিন ক্যাবলের মোট সক্ষমতা দাঁড়াবে প্রায় ৩৮ হাজার জিবিপিএস, যা বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী ডিজিটাল কানেক্টিভিটি হাবে রূপান্তর করবে।
এদিকে, ল্যান্ডিং স্টেশনের সফল ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গতকাল শনিবার (২৩ মে) ঢাকা প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কক্সবাজার স্টেশনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে কেক কাটেন উপ-মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোঃ তারিকুল ইসলাম। একই সময়ে ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে উর্ধতন কর্মকর্তাদের নিয়ে কেক কাটেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসলাম হোসেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি সাবমেরিন ক্যাবলের গড় আয়ু ২৫ বছর হলেও সঠিক ও বিশ্বমানের রক্ষণাবেক্ষণের কারণে কক্সবাজারের প্রথম ক্যাবলটি (সি-মি-উই ৪) এখনো চমৎকার 'কোয়ালিটি অব সার্ভিস' নিশ্চিত করে চলছে এবং এটি ২০৩০ সাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে পারবে।
দেশের প্রথম ক্যাবলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশের ইন্টারনেটের মূল কাঠামো কেমন হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনের উপ-মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোঃ তারিকুল ইসলাম (পিইঞ্জ) বলেন, ইতিমধ্যেই এর দীর্ঘমেয়াদী রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। সি-মি-উই ৬ চালুর পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশের ইন্টারনেটের আগামী ১৫ বছরের চাহিদা মেটাতে এবং ব্যাকআপ নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে চতুর্থ সাবমেরিন ক্যাবল 'সি-মি-উই ৭' (SEA-ME-WE-7) স্থাপনের মহাপরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করছে রাষ্ট্রীয় এই লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি।
ক্যাবলটি যেসব দেশের সমুদ্রপথ হয়ে কক্সবাজারে যুক্ত হচ্ছে:
১৯,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম ইউরোপকে সমুদ্রপথে সংযুক্ত করবে। এটি সিঙ্গাপুরের (তুয়াস) ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমার হয়ে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনে যুক্ত হবে। এরপর কক্সবাজার থেকে ক্যাবলটি ভারতের চেন্নাই ও মুম্বাই, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং পাকিস্তান হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব ও জিবুতি স্পর্শ করবে। সেখান থেকে লোহিত সাগর হয়ে এটি মিশরে প্রবেশ করবে এবং মিশরের স্থলপথ অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরের তলদেশ দিয়ে সর্বশেষ ফ্রান্সের মার্সেই (Marseille) ল্যান্ডিং স্টেশনে গিয়ে শেষ হবে। এই দীর্ঘ সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত প্রায় ডজনখানেকেরও বেশি দেশের ল্যান্ডিং স্টেশনকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় যুক্ত করা হচ্ছে।
'ডিজিটাল অন্ধকার' বা ব্যান্ডউইডথ সংকটের আশঙ্কা ভিত্তিহীন:
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাবমেরিন ক্যাবল নিয়ে ছড়ানো বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য ও 'ডিজিটাল অন্ধকার'-এর আশঙ্কাকে সম্পূর্ণ তথ্যভিত্তিক নয় এবং স্বার্থান্বেষী মহলের গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি)।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, দেশের প্রধান সংযোগসমূহ সিঙ্গাপুর-চেন্নাই এবং সিঙ্গাপুর-ফ্রান্স রুটে স্থাপিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক কোনো পরিস্থিতির কারণে দেশের ইন্টারনেট ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কোনো বাস্তব আশঙ্কা নেই। বর্তমানে সি-মি-উই ৪ এবং সি-মি-উই ৫ ক্যাবল অত্যন্ত নিরাপদ ও স্থিতিশীলভাবে পর্যাপ্ত সক্ষমতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।