বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি। অন্যদিকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি শিশু। শুধু ২০২৪ সালেই ক্যাম্পগুলোতে আনুমানিক ৪০ হাজার ৯০৯ শিশুর জন্ম হয়েছে।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের হোস্ট কমিউনিটির শিশুদের জন্য আনন্দময়, নিরাপদ এবং বিকাশ-উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা বর্তমানে অন্যতম বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় ব্র্যাক, ডেনমার্কভিত্তিক দাতা সংস্থা লেগো ফাউন্ডেশনের সহায়তায়, তাদের পরীক্ষিত হিউম্যানিটেরিয়ান প্লে ল্যাব (এইচপিএল) মডেলের ভিত্তিতে পাঁচ বছর মেয়াদি নতুন উদ্যোগ শুরু করেছে।
এইচপিএল মডেলে খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের আনন্দময় শেখার অভিজ্ঞতা তৈরি করা হয়, যা তাদের প্রারম্ভিক শিক্ষা ও মানসিক-সামাজিক বিকাশে সহায়তা করে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই উদ্যোগের আওতায় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঝুঁকিপূর্ণ হোস্ট কমিউনিটির ০ থেকে ১৮ বছর বয়সী ২ লাখ ২০ হাজার শিশুর কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি পাঁচটি মূল ধারার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। এগুলো হলো— সাড়া-প্রদানমূলক যত্ন (রেসপনসিভ কেয়ারগিভিং), খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় উত্তরণ সহায়তা, কিশোর-কিশোরী কার্যক্রম এবং সমন্বিত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা। পুরো উদ্যোগে অর্থায়ন করছে লেগো ফাউন্ডেশন।
বৃহস্পতিবার (২১ মে ) কক্সবাজারের একটি স্থানীয় হোটেলে আয়োজিত “শৈশব গড়ি, আগামীর প্রস্তুতি” শীর্ষক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ব্র্যাকের মানবিক সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (এইচসিএমপি)।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, মানবিক সহায়তাকর্মী, উন্নয়ন সহযোগী এবং কমিউনিটির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। শিশুদের সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করতে শিক্ষা, শিশু সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের মানবিক সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (এইচসিএমপি) ও ব্র্যাক হেলথ প্রোগ্রামের (বিএইচপি) ঊর্ধ্বতন পরিচালক ড. মো. আকরামুল ইসলাম। সমাপনী বক্তব্য দেন ব্র্যাক এইচসিএমপির সহযোগী পরিচালক ও অফিস ইনচার্জ (ওআইসি) রেজাউল করিম।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ব্র্যাক এইচসিএমপির স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট (ইসিডি) সেক্টরের প্রোগ্রাম ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) ডা. ইশাত নাবিলা।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন ব্র্যাকের শিক্ষা, অভিবাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান এবং ব্র্যাক হেলথ প্রোগ্রামের (বিএইচপি) সহযোগী পরিচালক ডা. শায়লা ইসলাম, কক্সবাজার জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের, ক্যাম্প ইন চার্জ (সিআইসি) গাজী শরিফুল হাসান (ক্যাম্প ৮ ইস্ট), সিআইসি- মো: মিনহাজুল ইসলাম (ক্যাম্প ১৮), সিআইসি- মোহাম্মদ আব্দুর রউফ (ক্যাম্প ৩ ও ৫) ও অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আরআরআরসি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— ব্র্যাক শিশুদের সামগ্রিক বিকাশকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে এই উদ্যোগের অংশ হতে পারি।”
অনুষ্ঠানে ‘প্রোগ্রাম ওভারভিউ’ বিষয়ে বিশেষ উপস্থাপনা তুলে ধরেন ব্র্যাক এইচসিএমপির স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট (ইসিডি) প্রোগ্রামের কোঅর্ডিনেটর ডা. এস এম হাসানুজ্জামান এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের (বিআইইডি) প্রোগ্রাম হেড সৈয়দা সাজিয়া জামান।
প্রকল্পটি ১৫টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার জেলার ৮টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হবে।
প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে— রেসপনসিভ কেয়ারগিভিং, হিউম্যানিটেরিয়ান প্লে ল্যাব ও প্লে ল্যাব কার্যক্রম, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় উত্তরণ সহায়তা, কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন কার্যক্রম, প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তি এবং সমন্বিত মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা।
আয়োজকরা জানান, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত ব্র্যাক ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশে প্রায় ৬০ হাজার স্কুল পরিচালনা করেছে। খেলাধুলাভিত্তিক শেখার এই ব্র্যাক প্লে ল্যাব মডেল বর্তমানে বাংলাদেশ, উগান্ডা ও তানজানিয়ায় সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।