নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে বলে ভোক্তারা অভিযোগ করছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, জুলাইয়ে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে, যা গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে, যা নয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে। কিন্তু এখানেই রয়েছে পরিসংখ্যান ও বাস্তব জীবনের বড় পার্থক্য।
সরকার বলছে, মূল্যস্ফীতির হার কমছে-কিন্তু বাজারের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। চাল, ডিম, চিনি, আটা, ময়দা, থেকে শুরু করে—নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামই আগের তুলনায় বেশি। ফলে মূল্যস্ফীতি কমার খবর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এখনো স্বস্তি আনতে পারেনি। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। গত ৬ মার্চ জ্বালানি তেলের সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকে। মূলত, উচ্চ মূল্যস্তরের ওপর নতুন করে মূল্যস্ফীতি যোগ হচ্ছে বলেই মানুষের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শহরের কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবজি, মুরগি, মাছ, ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম মসল্লাসহ বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দর বেড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতা। দাম বাড়তি থাকায় পছন্দের পণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে কিছুটা কম দরের পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। কেউ কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। এ কারণে পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, 'দাম আরও বাড়তে পারে কিংবা সংকট দেখা দিতে পারে– এমন ভীতি থেকে ক্রেতারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনছেন। একশ্রেণির ব্যবসায়ী এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দাম আরও বাড়িয়েছেন।'
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা পর্যায়ে খোলা সয়াবিনের লিটার বিক্রি হচ্ছে, ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকা এবং খোলা পাম তেল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রতি লিটার প্রায় ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দর ছিল যথাক্রমে ১৭৫ থেকে ১৮০ ও ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি।
এদিকে চিনির বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে প্রতি মনে বেড়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। আর খুচরা বাজারে প্রতি কেজিতে ৪-৫ টাকা বেড়ে ১২০-১২৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। চিনি কোথাও কোথাও ১২৫-১৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে ৫-১০ টাকা। এলাকাভেদে দাম আরও বাড়তি। দুই সপ্তাহ আগে দেশের বৃহৎ খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে মনপ্রতি (৩৭.৩২ কেজি) চিনি বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৬০০ টাকায়। গ্যাস সংকটের অজুহাতে বর্তমানে সেই চিনি বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৯০০ টাকায়। আবার কেউ চার হাজার টাকায়ও বিক্রি করছেন।
বড় বাজারের কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, 'জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভোজ্যতেল ও চিনির বাজারে।'
ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির বাজারেও অস্থিরতা চলছে। সোনালি মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকা টাকায়।
দুই মাস আগে যার দাম ছিল ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় এবং লেয়ার মুরগির কেজি ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা। কানাইয়া বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী নুরুল হক বলেন, 'খাদ্যর দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে মুরগীর বাজারে। এছাড়া বিদ্যুৎ, গাড়ি ভাড়া, মজুরি ভাড়াও বেড়েছে। তিনি বলেন, যারা মুরগীর খাবার ও বাচ্চা উৎপাদন করেন তাঁদের কারনে আজ বাজারের এই পরিস্থিতি। তাঁদের সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে না পারলে দাম আরও বাড়বে।'
বাজারে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে হাড় ছাড়া ১০০০ টাকা এবং হাড়সহ ৮০০ টাকা। মহিষের মাংস বিক্রি হচ্ছে ১১০০ টাকা। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি খাসির মাংস বর্তমানে ১,১০০ থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
বাহারছড়া বাজারের ব্যবসায়ী আবু বাহাদুর বলেন, 'খামার ও বাজারে পশুর দাম চড়া এবং উপকরণ খরচ বৃদ্ধি। যার প্রভাব পড়েছে বাজারে। হাড়সহ ৮০০ টাকা নিচে বিক্রি করলে লোকসানে পড়তে হবে।' এদিকে মাছের দাম আরও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে এমন মাছ রুই, কাতলা, তেলাপিয়া ও পাঙ্গাস মাছের দামও অনেক বাড়তি।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে পাঙ্গাস মাছ ১৭০-২০০-২৫০ টাকায়। কই (চাষের) ৩৫০-৪০০ টাকা, রুই ৩৪০-৩৬০ টাকা, মৃগেল ৩৫০ টাকা, কার্প ৪০০ টাকা, মিঠা পানির কোরাল ৮০০-১২০০ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০-৩০০ টাকা, ট্যাংড়া ৬০০-৭০০ টাকা। সাগরের সুরমা ৭০০- ৮০০ টাকা, তাইল্যা ৭০০-৯০০ টাকা, বাটা ৫০০-৬০০ টাকা, সাগরের কোরাল ১০০০-১৩০০ টাকা, রুপচাঁদা ১২০০-১৪০০ টাকা, ফইল্যা ১৩০০-১৪০০ টাকা, বাগদা চিংড়ি ৮০০-১০০০ টাকা, ছোট চিংড়ি ৭০০-৮০০ টাকা, ঘুইজ্যা আকারভেদে ৫০০-৮০০ টাকা, পাঁচমিশালী ২৫০-৩০০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, 'সাগরে আগের মত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া, তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মাছ পরিবহন ও সংরক্ষণের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। মাছ পঁচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন খরচ বাড়লে সরাসরি খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ে। চাষের মাছের ক্ষেত্রে, মাছের খাবারের (ফিড) দাম, বিদ্যুৎ বিল এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে।'
নুনিয়াছড়া এলাকার পাইকারি মাছ ব্যবসায়ী শফিউল আলম শফি বলেন, 'সাগরে আগের মত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। বোট বা ট্রলারে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম এবং ট্রলারের আনুষঙ্গিক খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে জেলেরা কম মাছ পেলেও খরচ তুলতে চড়া দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।'
এদিকে বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সবজির বাজার। ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজিতে বেড়ে প্রায় সবকটি সবজির কেজি শতক ছাড়িয়েছে। সবজির বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে নতুন কাঁকরোল ১০০-১২০ টাকা, কচুরলতি ৮০ টাকা, শসা বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৮০-১০০ টাকায়, টমেটো ১২০-১৪০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, লাউ ১ প্রতি পিস ৫০ টাকা ,মিষ্টি কুমড়া কেজি ৬০-৮০০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ১২০-১৪০ টাকা, কাঁচামরিচ ১২০-১৪০ টাকা, গাজর ১৪০টাকা, দেশি আলু ৮০-১০০ টাকা, ললিতা আলু ৩০ টাকা, শিম ১৬০ টাকা, বরবটি ১৪০ টাকা, পটল ৮০-১০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন খুচরা ব্যাবসায়ীরা। অন্যদিকে পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। বাজারে পেঁয়াজ ৪০-৫০ টাকা, রসুন ১৬০ টাকা এবং আদা ২৬০-২৮০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।
নিত্যপণ্যের পাশাপাশি রান্নার গ্যাসের দামও চড়েছে। বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৭০ টাকা। ফলে ১ হাজার ৫২৮ টাকা থেকে বেড়ে নতুন দাম হয়েছে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। তবে, এই দাম কাগজে কলমে থাকলেও ১৬০০-১৭০০ টাকা দামেও বিক্রি হচ্ছে এলপিজি।
কক্সবাজার এলপিজি সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম আরিফ লিটন বলেন, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম ও আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং কোম্পানিগুলো থেকে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হওয়ায় তাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
বাহারছড়া বাজার এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী শফিউল আলম জানান, 'পরিবহন খরচ যোগ করে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০ টাকা বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। দোকানে তালিকা আছে, সেই তালিকার দাম অনুযায়ী গ্যাস বিক্রি হচ্ছে।'
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, 'ব্যবসায়ীরা জ্বালানি সংকট দেখিয়ে মানুষের পকেট কাটছেন। সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছেই। অথচ সরকার বলছে, সবকিছু স্বাভাবিক। আগের সরকারগুলোও বলত– সব ঠিক আছে।'
তিনি বলেন, 'ব্যবসায়ীদের সুরে এ ধরনের বক্তব্যে মানুষের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা ফ্রি স্টাইলে দাম বাড়িয়ে ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে যেন জিম্মি করতে না পারে, সে জন্য সরকারকে কঠোর হতে হবে।নিয়মিত ও কার্যকর বাজার মনিটরিংয়ের অভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।'
নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাব নিয়ে ভোক্তাদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও নাভিশ্বাস তৈরি হয়েছে। ভোক্তারা বলছেন, চাল, ডাল, তেল, চিনি, ডিম, পেঁয়াজ, আলু ও সবজির দাম নিয়মিত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন বা জ্বালানি খরচের অজুহাতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত দাম বাড়ানো হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা কি করছেন। বাজারে কঠোর নজরদারি বা প্রশাসনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন বলে ক্রেতাদের অভিযোগ।
সরকারের তরফ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষের জন্য বাজারে স্বস্তি ফেরেনি।
জেলা ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক হাসান আল মারুফ বলেন, 'দাম নির্ধারণ করার আইন আমার নেই, দাম কেন বাড়ছে, কি কারনে বাড়ছে, এগুলোর জন্য আলাদা দপ্তর আছে; তারা এসব নিয়ে তদারকি করবেন। আমার কাজ খাদ্যর মান ও ভেজাল নিয়ে কাজ করা। তিনি বলেন, এতবড় একটা জেলায় শুধু একজন মানুষ কি আর করবো? এরপরেও যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে এবং অসংগতি পেলে সাথে সাথে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।'