মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
দৈনিক কক্সবাজার সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় লাগাতার ভারি বৃষ্টি,বন্যা ও পাহাড়ধসে শুধু কক্সবাজার জেলায় মোট ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিহত হয়েছেন, অনেকের দাবী ১৭জন। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে এ পর্যন্ত আশ্রয়শিবিরগুলোতে ৯৫টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এ সব ঘটনায় নিহত হয়েছেন শিশু সহ ১৫জন রোহিঙ্গা। গত দেড় বছরে আরাকান আর্মির নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য ১লাখ ৫২হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরগুলোতে আগে আসা আত্মীয়স্বজনদের সাথে থাকছেন। পরে শিবিরের অভ্যন্তরের বিভিন্ন পাহাড় কেটে ঘরবাড়ী তৈরী করে তারা থাকছেন বলে এক রোহিঙ্গা নেতা স্বীকার করেছেন। তাতে করে ভূমিধসের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এতে করে এখন বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহনকারী রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১৫ লাখ ৫২ হাজার হচ্ছে। বাংলাদেশীরা বনের গাছ কাটলে, পাহাড় কাটলে, বনবিভাগের জমি দখল করে ঘর নির্মাণ করলে বন আইনে ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ আইনে অনেকগুলো মামলা দায়ের করা হতো। কিন্তু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলা হয় নাই। ফিলিস্তিনে লাগাতার দুই বছরের অধিক সময় ধরে ইসরায়েলী গণহত্যাকারী নেতানিয়াহুর বাহিনী বিমান হামলা ও স্থল হামলা করে পাকা বাড়ীঘর গুড়িয়ে দেওয়া সহ ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনী নারী, শিশু, বৃদ্ধকে হত্যা করলেও তারা জন্মভূমি ছেড়ে পালিয়ে যান নাই। এখনও মাতৃভূমিকে আকড়ে ধরে আছেন। মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মি এ পর্যন্ত মোট ৭ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে মর্মে কোন সংবাদ মিডিয়ায় প্রচার হয়নি।
রোহিঙ্গা সমস্যা আমাদের ঘাড়ের উপর ডেকে আনা দীর্ঘস্থায়ী মারাত্মক সমস্যা তা অস্বীকার করা যাবে না। বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১৫ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গাদের অতি সত্তর তাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসনের কোন সম্ভাবনা নাই। কারণ আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়,চীন,মিয়ানমার জান্তা সরকার কেউ কথা রাখেন নাই। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবেগের বশে বা নিজে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হওয়ার জন্য বা পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ক্ষমতায় থাকাকে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় সহনীয় হিসেবে গ্রহন করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ খাওয়াতে পারলে কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকেও খাওয়াতে পারব ইনশাল্লাহ বলে ঘোষণা দিয়ে সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন। লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে যুগ যুগ ধরে আশ্রয় দেবো, খাওয়াবো বা পাকা ঘর করে দেব তা কখনও বলেন নাই। পাহাড়ধসে মৃত্যুর রাস্তা ২০১৭ সালেই প্রস্তুত করা হয়েছিল। কক্সবাজার এলাকার হাজার হাজার একর পাহাড়ের প্রাকৃতিক গাছগাছালি লতাপাতা জঙ্গল পরিস্কার করে বড় পাহাড় কেটে সমতল করে বা পাহাড়ের ঢালুতে অস্থায়ী গাছ বাঁশ দিয়ে ঘর তৈরী করে রোহিঙ্গারা নিজেরা আশ্রয় নিয়েছিল। দেশীবিদেশী এনজিওরাও তা করতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যক্ষ সাহায্য করেছে। ইউএনএইচসিআর সহ আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে বার বার অনুরোধ করেছে। এখন খবর প্রচার হয়েছে,পাহাড়ধসের উচিলায় রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ পাকা ঘর তৈরী করে দিতে আবদার করছে দেশীবিদেশী এনজিওগুলো। স্থানীয়রা রোহিঙ্গাদের জন্য পাকা সেড নির্মাণের অপচেষ্টার তীব্র বিরোধীতা করছেন। আগে কেটে ফেলা পাহাড়ে বা পাহাড়ের ঢালুতে পাকা ঘর নির্মাণ করলেও ভারি বৃষ্টি হলে পাহাড়ধস বা ভূমিধসের সম্ভাবনা থেকে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। উখিয়া-টেকনাফসহ কক্সবাজার জেলার স্থানীয় মানুষের বেশীর ভাগ ঘর কাচা । রোহিঙ্গাদের জন্য পাকা সেড নির্মাণের ব্যবস্থা করে দিলে আশ্রিত সাড়ে পনের লাখ রোহিঙ্গরা রাখাইন রাজ্যে আর ফেরত যাবে না। এখনও রাখাইন রাজ্যে অবস্থান করা লাখ লাখ রোহিঙ্গারাও বাংলাদেশে চলে আসতে প্রলুব্ধ হবে বা আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনী তাদের বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য করবে। সুতরাং প্রথম বাংলাদেশ, প্রথমে বাংলাদেশী স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আগে স্থানীয়দের পাকা ঘর নির্মাণ করে দিতে হবে। এর পরে মানবিক কারণে মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্য ক্যাম্পগুলোতে বা রাখাইন রাজ্যে বিশাল ভূমিতে তাদের নিয়ে গিয়ে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়, ইউএনএইচসিআর, দেশীবিদেশী এনজিও বা বাংলাদেশ সরকারও অধিকতর কিছু করলে স্থানীয়রা বা কক্সবাজারবাসী স্বাগত জানাবেন। পাহাড়ধসে,ভূমিধসে বা ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় একজন বাংলাদেশী মানুষ বা আশ্রিত রোহিঙ্গার মৃত্যু না হউক তা সকলের কাম্য। আল্লাহ ইতিমধ্যে মৃত্যু হওয়া মরহুমদের বেহেস্তে নসীব করুন। আল্লাহ বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা সকলকে হেফাজত করুন।