কক্সবাজারের মহেশখালীতে চোর সন্দেহে মো. ফয়সাল (২৬) নামে এক যুবককে দড়ি দিয়ে বেঁধে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টার দিকে উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের ফকিরাঘোনা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত ফয়সাল ওই এলাকার বাদশা মিয়ার ছেলে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, চোর সন্দেহে একই এলাকার কৈফায়ত উল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্যরা ফয়সালকে আটক করেন। পরে কৈফায়ত উল্লাহসহ ১০ থেকে ১৫ জন মিলে তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
একপর্যায়ে ফয়সালকে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এরপর তার কাঁধ ও পিঠের ওপর প্রায় ২০টি ইট রাখা হয়। এ সময় নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে কয়েকজন উল্লাস করেন বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতেও একদল কিশোরকে ফয়সালকে মারধর করতে দেখা গেছে বলে জানা গেছে। ভিডিওটির সত্যতা ও এতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পরে গ্রাম পুলিশের সহযোগিতায় গুরুতর আহত অবস্থায় ফয়সালকে উদ্ধার করে মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুস সুলতান জানান, স্টিলের আলমারি, ওয়ারড্রোব ও কেবিনেট তৈরির কাজ হয় এমন একটি ভবনে চুরি করতে ঢোকার সন্দেহে ফয়সালকে আটক করা হয়েছিল।
ওসি বলেন, ফয়সালকে মারধর করে বেঁধে রাখা হয়েছিল। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই বাড়ির এক যুবককে আটক করা হয়েছে জানিয়ে ওসি বলেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং এ ঘটনায় মামলা হবে।
ওসি আরও বলেন, মারধর করে বেঁধে রাখা হয়েছিল। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। খুবই অন্যায় কাজ হয়েছে।
তবে স্থানীয়ভাবে ফয়সালের চুরি করার অভ্যাস রয়েছে এমন তথ্য পুলিশ পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
নিহত ফয়সালের বাবা নুরুল আলম বলেন, মঙ্গলবার ফজরের পর ঘুম থেকে উঠে তিনি ছেলেকে মারধর করে হাসপাতালে নেওয়ার খবর পান।
তিনি বলেন, মানুষ এসে বলছে, তোমার ছেলেকে মেরে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখি ছেলে মৃত।
নুরুল আলমের দাবি, ফয়সাল তার সঙ্গে সড়কের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। মঙ্গলবার সকালে কাজে যাওয়ার জন্য লোকজন ডাকতে বের হয়েছিলেন তার ছেলে।
চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ফয়সাল চুরি করলে তার কাছে চুরি করা মালামাল থাকার কথা। কিন্তু তার ছেলের কাছ থেকে মোবাইল, টাকা, স্বর্ণ বা অন্য কোনো চোরাই মালামাল পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
ফয়সালের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো মামলা করা হয়নি। তবে পরিবার অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ওসি।
পুলিশ নিহতের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে।
তবে ফয়সাল সত্যিই চুরি করতে গিয়েছিলেন কি না, তাকে কারা আটক করেছিলেন, কতজন তাকে মারধরে অংশ নিয়েছেন এবং নির্যাতনের ফলে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন।
চোর সন্দেহে কাউকে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।