যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে যে হামলা চালিয়েছে, সেটাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে তেহরানের সবচেয়ে শক্তিধর দুই কূটনৈতিক মিত্র— চীন ও রাশিয়া।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে মেরে ফেলাটা ‘মানবিকতার সমস্ত আদর্শের নির্লজ্জ লঙ্ঘন’ হিসেবে দেখছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
অন্যদিকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, ‘বলপ্রয়োগে কখনো টেকসই সমাধান নিয়ে আসে না’।
তেহরানের এই দুই মিত্র মিলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে অনুরোধ জানিয়েছে, যেন ইরান যুদ্ধ নিয়ে একটা জরুরি বৈঠক ডাকা হয়।
এসব প্রতিক্রিয়া মূলত ইরানের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতারই প্রকাশ।
মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে ইরানের একাধিক চুক্তি রয়েছে। তারা যৌথভাবে নৌ-মহড়াও চালায়।
কূটনৈতিক সখ্যতার ব্যাখ্যায় দেশ তিনটির যুক্তি, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে চায়। সেই প্রচেষ্টা প্রতিহত করতেই তারা ঐক্যবদ্ধ থাকতে চায়।
কিন্তু ইরানের প্রতি এত পক্ষপাতমূলক কথাবার্তা বললেও সামরিক সহায়তা দেওয়ার কোনো আগ্রহ চীন কিংবা রাশিয়ার পক্ষ থেকে আসেনি।
ইরান-রাশিয়া: কৌশলগত সঙ্গী, সামরিক মিত্র নয়
গত বছরের জানুয়ারিতে বাণিজ্য ও সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে ইরান ও রাশিয়া। চুক্তিতে ব্যবসা ও সামরিক সহযোগিতা থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিক্ষার পাশাপাশি অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তিতে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সমন্বয় আরও গভীর করার সুযোগও রয়েছে। ইরানের মাধ্যমে রাশিয়াকে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্ত করার লক্ষ্যে করিডোর দেওয়াসহ বিভিন্ন প্রকল্পে সমর্থনের কথাও এতে আছে।
সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা দেখাতে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা শুরুর সপ্তাহ খানেক আগে ভারত মহাসাগরে রাশিয়া ও ইরান যৌথভাবে সামরিক মহড়াও চালায়।
তবে ইরানের যুদ্ধে সম্পৃক্ত হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা রাশিয়ার নেই। কারণ তাদের মধ্যকার চুক্তিতে যৌথ প্রতিরক্ষার ‘ধারা’ বলে কিছু নেই। ফলে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়।
রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের সাবেক মহাপরিচালক আন্দ্রে কোরতুনোভ বলেন, ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়া যে চুক্তি করেছে, সেটাকে বরং প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে।
মস্কো থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ওই চুক্তি অনুযায়ী উত্তর কোরিয়ার যেকোনো সংঘাতে রাশিয়া পাশে দাঁড়াতে বাধ্য থাকবে।
“কিন্তু ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে শুধু এটুকুই বলা আছে, দুই পক্ষের কেউ সংঘাতে জড়ালে অন্য পক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেবে না।”
কোরতুনোভ মনে করেন, ইরানের সমর্থনে রাশিয়ার সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ এতে ঝুঁকি খুব বেশি।
মস্কোভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের’ এ সদস্য মনে করেন, রাশিয়া সম্ভবত ইউক্রেইন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান মধ্যস্থতার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
পুতিনের এমন মনোভাবের উদাহরণ তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান ও দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসার সময় রাশিয়া একই পথ বেছে নিয়েছিল।
“রাশিয়া কোনো সামরিক সহায়তা দেয়নি, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।”
সামরিক চুক্তি না থাকলেও রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে ইরানের কিছু মানুষের মধ্যে হতাশা রয়েছে বলে মনে করেন কোরতুনোভ।
হতাশায় ভোগা মহলে নিজের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “তাদের প্রত্যাশা ছিল, রাশিয়া হয়ত ইরানের জন্য জাতিসংঘের মতো মঞ্চে দৌড়াদৌড়ির চেয়ে বেশি কিছু করবে।”
ইরান-চীন সখ্যতা ও সীমাবদ্ধতা
২০২১ সালে ২৫ বছরের জন্য সহযোগিতা চুক্তি করে চীন ও ইরান, যার লক্ষ্য ছিল জ্বালানির মতো খাতগুলোতে সম্পর্ক জোরদার এবং ইরানকে 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে’ অন্তর্ভুক্ত করা।
চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির (সিআইএসএস) গবেষক জোডি ওয়েন, বেইজিংয়ে এই সম্পর্ককে ব্যাপক বাস্তবসম্মত ও স্থিতিশীল হিসেবে দেখা হয়।
বেইজিং থেকে টেলিফোনে আল জাজিরাকে তিনি বলেন, "রাজনৈতিক দিক থেকে আমাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। আর অর্থনৈতিক দিক থেকে এই সহযোগিতা অত্যন্ত গভীর। ইরানে চীনের অনেক কোম্পানির বিনিয়োগ রয়েছে।"
তবে এই অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে চীন অনেক আগে থেকেই কিছু সীমারেখা টেনে রেখেছে, বিশেষ করে সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
জোডি ওয়েন বলের, “চীন সরকার সব সময় অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি মেনে চলে। আমি মনে করি, চীন সরকার ইরানে কোনো অস্ত্র পাঠাবে না।”
এর পরিবর্তে বেইজিং বরং কূটনীতি এবং চলমান সংকট ব্যবস্থাপনায় বেশি গুরুত্ব দেবে বলে মনে করেন তিনি।
"আমার দৃষ্টিতে, পরিস্থিতি শান্ত রাখতে চীন তাদের মতো করে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”
সম্পর্কের এই স্বচ্ছতা তেহরানের মধ্যে চীনের বিষয়ে আস্থা তৈরিতে সাহায্য করেছে বলেও মনে করেন এই বিশ্লেষক।
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এটাও বলছেন, চীন ও ইরানের সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ নয়।
জাহাজ ট্র্যাকিং পরিষেবা 'কেপলারের’ হিসাব অনুযায়ী, ইরানের বার্ষিক অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৮৭ দশমিক ২ শতাংশ যায় চীনে, যা তেহরানের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চীনের বিশ্ব বাণিজ্যে তেহরানের অংশ একেবারেই সামান্য।
সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির পাবলিক পলিসি অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স প্রোগ্রামের সহযোগী অধ্যাপক ডিলান লোহ বলেন, ইরান বিষয়ে চীনের ভূমিকা এখন ‘রক্ষাকর্তার ভূমিকায়’ রূপ নিয়েছে।
“তারা তাদের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে আরও ত্বরান্বিত করছে, যেন একটি আঞ্চলিক বিপর্যয় রোধ করা যায়। কারণ এই বিপর্যয় চীনের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার স্বার্থকে হুমকিতে ফেলতে পারে।"
অন্য মিত্রদের কী হাল
একাধিক দেশের বেশ কয়েকটি সংগঠন নানা সময়ে ইরানের হয়ে অস্ত্র হাতে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিরক মিত্র ধরা হয় হেজবুল্লাহকে।
এর বাইরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, গাজার হামাস, প্যালেস্টিনিয়ান ইসলামিক জিহাদ ও ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া নেটওয়ার্কের মতো কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীও ইরানের সামরিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এসব গোষ্ঠী নানা জটিল সমীকরণের মুখে প্রত্যাশিত সামর্থ্য নিয়ে ইরানের পাশে দাঁড়াতে পারছে না।
ইরানে হামলা শুরুর দুই দিন পর ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। জবাবে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি এবং বেকা উপত্যকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালায় ইসরায়ে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
নিজ দেশের জনগণের স্বার্থে লেবানন সরকার হিজবুল্লাহকে যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
বৈরুতভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলি রিজক বলেন, "হিজবুল্লাহর বিশ্বাস, পশ্চিমাদের নিশানার তালিকায় ইরানের পরেই তাদের নাম রয়েছে।”
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “নতুন করে ইসরায়েলি হামলার পরেও গোষ্ঠীটির কাছে শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে।"
অন্যান্য মিত্রের মধ্যে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আছে ইয়েমেনের হুথিরা।
শনিবার ইরানে হামলা শুরুর পর নিজের প্রথম টেলিভিশন ভাষণে হুথি নেতা আবদেল মালেক আল হুথি বলেন, তার বাহিনী ‘যেকোনো পরিস্থিতির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত’।
ইরান ‘যথেষ্ট শক্তিশালী’ এবং তারা ‘সমুচিত জবাব’ দেবে বলেও বক্তব্যে তুলে ধরেন তিনি। কিন্তু বিশ্লেষকরা তার এই ভাষ্যকে দেখছেন হুথিদের তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধের চাপ থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে।
আল জাজিরা লিখেছে, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা কিংবা তেল আবিবে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে সফল হলেও হুথিরা প্রচণ্ড চাপে রয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের এ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার লড়াইয়ে জয়ী হয়ে ‘আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত’ ইয়েমেনি সরকার নিজেদের অনেকটাই স্থিতিশীল ভাবছে।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাহের আল-আকিলি সম্প্রতি বলেছেন, "তাদের অভিযানের লক্ষ্য এখন রাজধানী সানার দিকে, যা বর্তমানে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে।
তার এই বক্তব্য মূলত হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকা পুনরুদ্ধারে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের আভাস দেয়, যা হুথিদের কঠিন সংকটে ফেলে দিয়েছে।
ইরান যুদ্ধ: মস্কোর কী লাভ, কী ক্ষতি?
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউসের ইউরোপ ও রাশিয়া বিভাগের পরিচালক গ্রেগোয়ার রুস বলেছেন, ইরানে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মস্কোর জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
“কারণ সংবাদমাধ্যমে ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির গুরুত্ব কমে যাবে; সব মনোযোগ চলে যাবে মধ্যপ্রাচ্যে।"
এর বাইরে রাশিয়ার স্বার্থের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “ইরান যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় ওয়াশিংটন কূটনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে অন্য কোনো ফ্রন্টে সমর্থন যোগাতে পারবে না। তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় মধ্যপ্রাচ্যই সবার উপরে থাকবে।"
তবে ইরানে বর্তমান শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটলে সেটা রাশিয়ার বৈশ্বিক ভাবমূর্তির জন্য সুখকর হবে না বলে মনে করেন রুস।
তিনি বলেন, "রাশিয়া সবসময় নিজেদের একটা পরাশক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করে। তারা ইরান, সিরিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো নিয়ে গঠিত একটি গ্রুপের অংশ, যারা পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে একটা বলয় গড়তে চায়।
"কিন্তু এই গ্রুপটি এর আগে এত কোনঠাসা কখনো হয়নি, যা ইউরেশীয় প্রভাব বলয়ে রাশিয়ার আধিপত্য খর্ব হওয়ারই আভাস দেয়।”
রাশিয়া ও চীন সামরিক সহায়তা না দিলেও ইরান নিজেদের স্বার্থে তাদেরসঙ্গে দূরত্ব চাইবে না বলে মনে করেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ঘায়েদি মনে করেন, পশ্চিমের সঙ্গে সংঘাতের কারণে বর্তমান ইরানি প্রশাসন এখনও মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে।
"তেহরান এই অংশীদারত্ব হারানোর ঝুঁকি নেবে না, বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকার কারণে।"
হিসাব আছে বাণিজ্যেরও
কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, কেবল সামরিক চুক্তি না থাকাই চীন-রাশিয়ার দূরে থাকার একমাত্র কারণ নয়। তেহরানের বিষয়ে ভাবতে গিয়ে বাণিজ্যিক অনেক হিসাব-নিকাশও মাথায় রাখতে হচ্ছে দেশ দুটিকে।
মস্কো ও তেহরানের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি থাকার কথা তুলে ধরে রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক নিকিতা স্মাগিন বলেন, পুতিনের কাছে ‘ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর’ (আইএনএসটিসি) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, “২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেইনে যুদ্ধে জড়ানোর পর রাশিয়া বেশ কয়েকটি ট্রানজিট রুট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ কারণে নতুন করিডোর পুতিনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
ভারত, ইরান, আজারবাইজান, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়াকে সড়ক ও রেলপথে যুক্ত করেছে আইএনএসটিসি। যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই করিডোর ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত সময় বাঁচিয়ে দেয়।
রাশিয়া, ভারত ও ইরান ২০০০ সালে এই করিডোর ঘিরে ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটারের ‘মাল্টি-মোড নেটওয়ার্কের’ চুক্তি সই করে ।
সৌদি আরবভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'গালফ রিসার্চ সেন্টার' বলেছে, এই প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
নিকিতা স্মাগিনের মতে, রাশিয়া ও ইরানের অংশীদারত্বে আদর্শিক কোনো জায়গা নেই। রাশিয়ার অনেক রাজনীতিক ইরানকে খুব একটা পছন্দ করেন না। কিন্তু তারপরও নির্ভরযোগ্য কৌশলগত অংশীদার হিসেবে তারা ইরানকে পাশে রাখে।
“কারণ উভয় দেশই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছে। এছাড়া ইরান কিন্তু তুরস্ক বা মিশরের মতো নয়, যারা পশ্চিমের চাপে যেকোনো সময় রাশিয়ার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে পারে।"
কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের সঙ্গে করা রাশিয়ার চুক্তিও পুতিনের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
এর উদাহরণ টানতে গিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে রাশিয়ার করা 'অনাক্রমণ চুক্তির' কথা সামনে আনছেন তারা।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মোহাম্মদ ঘায়েদি মনে করেন, রাশিয়ার সামরিক সহায়তা না পাওয়াটা ইরানি নেতাদের জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল না।
"মস্কোর ওপর নির্ভর করার বিষয়ে তেহরান দীর্ঘকাল ধরে সংশয়ে আছে। যেমন সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ একবার বলেছিলেন, ‘রাশিয়া সব সময় ইরানি জাতিকে বিক্রি করে দিয়েছে'।
“গত বছরের জুনে ইরানে মার্কিন হামলার পর প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘যাদের আমরা বন্ধু ভেবেছিলাম, যুদ্ধের সময় তারা সাহায্য করেনি'।”
ইরান যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য অর্থনৈতিক সুবিধাও বয়ে আনতে পারে।
ইরান হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাবে এরই মধ্যে জ্বালানি পণ্যের বাজার চড়তে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর নাভাল অ্যানালাইসিসের ‘রাশিয়া স্টাডিজ প্রোগ্রামের’ গবেষক জুলিয়ান ওয়ালের বলেন, "যদি তেল ও গ্যাসের দাম কয়েক মাস বা এক বছর ধরে চড়া থাকে, তবে তা তেল-গ্যাস রপ্তানিকারক রাশিয়ার জন্য লাভজনকই হবে। পুতিন তখন যুদ্ধে অর্থায়নের জন্য সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ থেকে অনেকটাই মুক্তি পাবেন।"