ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বর্ষণের বিরতির পর ফের স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত রূপে ফিরেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার। সাপ্তাহিক ছুটিকে কেন্দ্র করে সৈকতজুড়ে ভিড় করেছেন হাজারো ভ্রমণপিপাসু। তবে সাগর এখনও উত্তাল থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাল পতাকা টানিয়ে সতর্কতা জারি করেছে লাইফ গার্ড সংস্থা। এদিকে ৫০ শতাংশ ছাড়ে হোটেল-মোটেলে বুকিংও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত; গত কয়েকদিন ধরে বজ্রপাত ও ভারী বর্ষণে যেখানে ছিল পর্যটকশূন্য, সেখানে এখন আবারও ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। বৈরী আবহাওয়ার বিরতি মিলতেই সাপ্তাহিক ছুটির দিনে জনসমাগমে মুখর হয়ে উঠেছে বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকত।
সাগরপাড়ে এখন শুধুই মানুষের ঢল। নীল জলরাশি আর বালিয়াড়ির বিস্তীর্ণ প্রান্তে পরিবার-পরিজন নিয়ে পর্যটকদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে পুরো সৈকত এলাকা। কেউ বালুচরে খেলায় মেতে উঠেছেন, কেউ সমুদ্রস্নানে, আবার কেউ জেটস্কি, ঘোড়ার পিঠে চড়া কিংবা কিটকটে বসে উপভোগ করছেন নোনাজলের সৌন্দর্য। ছবি তোলা আর আড্ডায় জমে উঠেছে পুরো সৈকত।
মিরপুর থেকে আসা পর্যটক হাবিবুর রহমান বলেন, জীবনে প্রথমবার ঘোড়ায় উঠলাম-অভিজ্ঞতাটা সত্যিই দারুণ। একটু ভয় লাগছিল, কিন্তু সেই ভয়টাই যেন আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন কিছু করার এই অনুভূতি অনেক উপভোগ করেছি।
নরসিংদী থেকে আসা পর্যটক পিয়াল রহমান বলেন, প্রিয়জনদের সঙ্গে কক্সবাজারে ঘুরতে এসে অসাধারণ সময় কাটছে। সুন্দর পরিবেশ, মনোরম আবহাওয়া, বিচে ঘোরাঘুরি, বাইক রাইড-সব মিলিয়ে ভীষণ ভালো লাগছে। এখানকার মানুষজনও খুব আন্তরিক। এর আগে দুইবার এসেছি, এবার তৃতীয়বার-আর সামনে আবার আসার ইচ্ছা আছে।
কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক শাহেদ আলম বলেন, কক্সবাজার মানেই আমার কাছে আনন্দ, মানসিক শান্তি আর এক ধরনের মুক্তির জায়গা। বিশেষ করে শুক্রবারের ছুটিতে এখানে ভিড় জমে নানা পেশার মানুষের। মন খারাপ বা চাপ লাগলে আমরা বারবার এখানেই ফিরে আসি-সমুদ্রের বাতাস যেন সব ক্লান্তি দূর করে দেয়।
তবে আনন্দঘন এই ভিড়ের মাঝেও ঝুঁকি রয়ে গেছে সমুদ্রে। বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে শুক্রবার (০১ মে) ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল ছিল। আর শনিবার (০২ মে) ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত নামিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সাগর উত্তাল থাকায় সৈকতের বালিয়াড়িতে লাল পতাকা টানিয়ে বিপদজনক এলাকা চিহ্নিত করে দিয়েছে লাইফ গার্ড সংস্থা। তারপরও কিছু পর্যটক নির্দেশনা না মেনে উত্তাল সাগরে নেমে পড়ছেন। তাদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন লাইফ গার্ডকর্মীরা।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সিনিয়র লাইফ গার্ড রুহুল আমিন বলেন, সাগর বর্তমানে খুবই উত্তাল থাকায় আমরা লাল পতাকা সংকেত দিয়েছি। পানির স্রোতও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, তাই পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটক সমুদ্রসৈকতে আসছেন, তাই সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে যেন কেউ নির্ধারিত সীমার বাইরে না যান এবং আউটসাইডে গোসল না করেন। পর্যটকদের বারবার জানানো হচ্ছে-হাঁটু পানির বেশি গভীরে না যেতে এবং লাইফগার্ডদের নির্দেশনা মেনে চলতে।
সবার নিরাপত্তার স্বার্থে লাইফগার্ডরা নিয়মিত মাইকিং করে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন এবং সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন।
এদিকে পর্যটক আকৃষ্ট করতে কক্সবাজারের হোটেল-রিসোর্টগুলোতে চলছে বিশেষ ছাড়। অনেক প্রতিষ্ঠানই দিচ্ছে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ও।
তারকামানের হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিং পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে। গত কয়েকদিনের বৈরী আবহাওয়ার পর আজ থেকে আবহাওয়া উন্নতির দিকে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সাপ্তাহিক ছুটি দিনগুলোতে হোটেলের বুকিং ভালো হয়েছে। সামনে পুরো মাসজুড়েই পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশাবাদী। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে হোটেলে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিশেষ ছাড়ও চালু করা হয়েছে।
কক্সবাজারে আবারও ফিরেছে পর্যটকের ঢল, তবে সাগরের উত্তাল ঢেউ আর লাল পতাকার সতর্কতা মনে করিয়ে দিচ্ছে-আনন্দের পাশাপাশি প্রয়োজন সর্বোচ্চ সতর্কতাও।