সাগরপথে অবৈধভাবে মিয়ানমারে জ্বালানি তেল পাচার রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে কোস্টগার্ড। নাফ নদী থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্র ও উপকূলজুড়ে জোরদার করা হয়েছে টহল। বাড়ানো হয়েছে জনবল, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। একই সঙ্গে জলদস্যুতা ঠেকাতেও জোরদার করা হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থির হয়ে উঠেছে জ্বালানি তেলের দাম। এমন অবস্থায় দেশের জ্বালানি তেলের মজুদ সংরক্ষণ ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার দিয়েছে নানা নির্দেশনা। আর এ সুযোগে যাতে সাগরপথে তেল পাচার না হয়, সে জন্য কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদীর জলসীমায় একাধিক নৌযান নিয়ে চলছে নিয়মিত টহল কার্যক্রম। বাড়ানো হয়েছে জনবলও। উদ্দেশ্য-জ্বালানি তেল পাচার, চোরাচালান, মাদক ও মানবপাচারের পাশাপাশি জলদস্যুতা প্রতিরোধ।
শুধু নাফ নদী নয়, গভীর সমুদ্র থেকে শুরু করে উপকূলজুড়ে কঠোর নজরদারিতে রয়েছে উপকূলরক্ষী বাহিনী কোস্টগার্ড। সাগরে চলাচলকারী সব ধরনের জলযান সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। কোনো নৌযানের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলেই তা থামিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। কোস্টগার্ডের এমন তৎপরতায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন জেলেরা।
এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের জেলে রশিদ আহমদ বলেন, আমাদের দেশের জ্বালানি তেল দেশের মধ্যেই সংরক্ষিত থাকুক, যাতে তা মিয়ানমারে পাচার না হয়। তেল পাচার বন্ধে কোস্টগার্ডের চলমান অভিযানকে তিনি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
একই ট্রলারের জেলে ইব্রাহিম বলেন, দেশের সম্পদ যেন কোনোভাবেই বিদেশে পাচার না হয়। জ্বালানি তেল নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব যাতে জেলেদের ওপর না পড়ে এবং তাদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কক্সবাজার, মহেশখালী, সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া ও বাঁশখালী উপকূলের জলদস্যু চক্র। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মাছ ধরার ট্রলার তাদের হামলার শিকার হচ্ছে। জেলেদের দাবি-সাগরের যেসব এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, সেখানে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টহল আরও বাড়ানো হোক।
এফবি ইশফা ট্রলারের জেলে রবিউল আলম বলেন, বর্তমানে সাগরে মাছ ধরতে যেতে অনেক ভয় লাগে। কারণ গভীর সাগরে জলদস্যুদের তৎপরতা আগের চেয়ে বেড়েছে, যা জেলেদের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
একই ট্রলারের আরেক জেলে রায়হান আলী বলেন, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া ও বাঁশখালী এলাকার কিছু জলদস্যু জেলেদের ছদ্মবেশে সাগরে নেমে হামলা চালাচ্ছে এবং ট্রলারের মালামাল লুটে নিচ্ছে। তিনি জানান, গভীর সাগরে যেখানে নেটওয়ার্ক সুবিধা নেই, সেখানে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টহল আরও জোরদার করা হলে জেলেরা নিরাপদে মাছ শিকার করতে পারবেন।
কোস্টগার্ড জানায়, জলদস্যুতা নির্মূলে সাঁড়াশি অভিযানের পাশাপাশি সাগরপথে জ্বালানি তেল পাচার ঠেকাতেও তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশনের কমান্ডার লে: কমান্ডার শাহিন আলম বলেন, “কোস্টগার্ড চট্টগ্রাম বেসের অধীনস্থ জাহাজ শ্যামল বাংলা এবং স্টেশন কক্সবাজার, মহেশখালী, মাতারবাড়ি, কুতুবদিয়া ও শাহপরীর দ্বীপের আওতাধীন সমুদ্র এলাকায় জলদস্যু ও ডাকাত দমনে এবং সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। দেশের সাগর, নদীপথ ও উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ড ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখবে।
শাহিন আলম আরও বলেন, বর্তমানে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে চলাচলরত বিভিন্ন নৌযান ও ট্রলারে অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযানের পাশাপাশি এসব নৌযানে জ্বালানির জন্য নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত তেল মজুদ রয়েছে কি না তাও তল্লাশি করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে কোস্টগার্ড নিয়মিত টহল কার্যক্রম জোরদার করে চলেছে।
গত দুই মাসে অভিযান চালিয়ে ৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র ও ৬ রাউন্ড গুলিসহ ৩০ জন ডাকাত ও জলদস্যুকে আটক করেছে কোস্টগার্ড। একই সঙ্গে ডাকাতের কবল থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৩২ জন জেলেকে।