কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনটি বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে সবসময়ই এক আলোচিত জনপদ। মাদক চোরাচালান, রোহিঙ্গা সংকট এবং সীমান্ত উত্তেজনার মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জে ঘেরা এই অঞ্চলের মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে পঞ্চমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও বিএনপি নেতা শাহজাহান চৌধুরী। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই নেতা দায়িত্ব গ্রহণের পর গতকাল মুখোমুখি হয়েছিলেন দৈনিক কক্সবাজার-এর।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পত্রিকার পরিচালনা সম্পাদক মোহাম্মদ মুজিবুল ইসলাম। এসময় সাথে ছিলেন বিশেষ প্রতিবেদক মাহবুব রোকন, সিনিয়র রিপোর্টার তাজুল ইসলাম পলাশ, উখিয়ার স্টাফ রিপোর্টার ফারুক আহমদ, রামুর স্টাফ রিপোর্টার সোয়েব সাঈদ।
একান্ত আলাপে উঠে এসেছে উখিয়া-টেকনাফের আগামীর উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্থবির হয়ে পড়া সীমান্ত বাণিজ্য সচল করা এবং মাদক ও পাহাড়ী সন্ত্রাস দমনে কঠোর অবস্থানের কথা। সাক্ষাৎকারে শাহজাহান চৌধুরী তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও আঞ্চলিক সংকট নিরসনে যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন, তার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
দৈনিক কক্সবাজার: অভিনন্দন আপনাকে। টানা পঞ্চমবারের মতো এই গুরুত্বপূর্ণ আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এবার উখিয়া-টেকনাফ নিয়ে আপনার অগ্রাধিকারমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো কী?
শাহজাহান চৌধুরী: ধন্যবাদ। উখিয়া-টেকনাফ দেশের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং আসন। আমাদের প্রধান লক্ষ্য তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা এবং মাদকের অভিশাপ থেকে এই প্রজন্মকে রক্ষা করা। আরেকটি বড় সমস্যা হলো সুপেয় পানির সংকট। আমি চাই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে নাফ নদী বা রেজুখাল থেকে পানি শোধন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করতে। এছাড়া পাহাড় রক্ষা, বনায়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি টেকসই পরিবেশ গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
দৈনিক কক্সবাজার: টেকনাফ স্থলবন্দর ও শাহপরীর দ্বীপ করিডোর দীর্ঘ দিন ধরে স্থবির। নাফ নদীতে মাছ ধরাও বন্ধ। অর্থনৈতিক এই স্থবিরতা কাটাতে আপনার পদক্ষেপ কী হবে?
শাহজাহান চৌধুরী: স্থলবন্দরটি বৈধ বাণিজ্যের প্রাণ। আমি ইতোমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসেছি এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ে কথা বলে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর চেষ্টা করছি। শাহপরীর দ্বীপ করিডোর চালুর বিষয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা চলছে। আর নাফ নদীতে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের অগ্রাধিকার। সম্প্রতি অনেক জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার তথ্য পেয়েছি, তাদের উদ্ধারে ও জেলেদের নির্বিঘ্নে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ করে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর।
দৈনিক কক্সবাজার: আপনি তরুণদের জন্য টেকনিক্যাল কলেজ ও মহিলাদের জন্য গ্রাম পর্যায়ে ক্লাবের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এগুলো কিভাবে বাস্তবায়ন হবে?
শাহজাহান চৌধুরী: উখিয়ার পালংখালী বা গাইলামারা এলাকায় একটি নতুন টেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে। আমরা চাই আমাদের সন্তানরা যেন শুধু ক্যাম্পের চাকরির পেছনে না ছুটে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান পায়। নারীদের জন্য কয়েকটি মডেল গ্রাম বেছে নিয়ে সেলাই, নকশিকাঁথা, কারুশিল্প ইত্যাদিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে আয়ের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় সমন্বয় আনার জন্য কওমি মাদ্রাসা, সরকারি মাদ্রাসা, কেজি স্কুলসহ নানান প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার বিষয়েও চিন্তা করছি।
দৈনিক কক্সবাজার: রোহিঙ্গা সংকট এই অঞ্চলের প্রধান উদ্বেগের কারণ। সংসদ সদস্য হিসেবে এই জটিল ইস্যুতে আপনার কূটনৈতিক বা সংসদীয় তৎপরতা কেমন হবে?
শাহজাহান চৌধুরী: এটি এখন একটি বিশাল বৈশ্বিক ইস্যু। আমাদের স্থানীয় জনসংখ্যার চেয়ে রোহিঙ্গার সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি, যা পরিবেশ ও অবকাঠামোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। আমি সংসদে এই বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করবো। নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই আমাদের মূল লক্ষ্য এবং এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে সমন্বয় করে কাজ করবো।
দৈনিক কক্সবাজার: মাদক ও সন্ত্রাস দমনে আপনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ আছে, চিহ্নিত মাদক কারবারিরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সরকারি দলে ঢোকার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে আপনার অবস্থান কী?
শাহজাহান চৌধুরী: আমার নীতি স্পষ্ট—মাদক কারবারি বা অপরাধীর কোনো দল নেই। যারা মাদক বা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের দমনে কোনো আপস করা হবে না। আমি অত্যন্ত সতর্ক আছি যাতে কোনো বিতর্কিত ব্যক্তি দলে ভিড়তে না পারে। প্রশাসনকেও এ ব্যাপারে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দৈনিক কক্সবাজার: পাহাড় ও জলপথে অপহরণ ও সন্ত্রাস দমনে রাষ্ট্রীয়ভাবে কী ধরণের পদক্ষেপ নেবেন?
শাহজাহান চৌধুরী: পাহাড়ে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের বিষয়টি উদ্বেগের। এটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। রোহিঙ্গা আসার পর তা বেড়েছে। আমি নিজে তথ্য সংগ্রহ করছি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করছি। এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবো। বর্ডার গার্ডের কার্যক্রমও মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে।
দৈনিক কক্সবাজার: সামনেই স্থানীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে আপনার বা দলের ভূমিকা এবং নেতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে 'মানি, ম্যান ও মাশল' পাওয়ারের যে সমালোচনা হয়, তা থেকে বেরিয়ে আসতে আপনার কৌশল কী হবে?
শাহজাহান চৌধুরী: মাসল পাওয়ার আগের তুলনায় কমেছে, কিন্তু এখন ফেসবুকের অপব্যবহার বড় সমস্যা।
টাকা দিয়ে ভোট কেনার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। এটি মানসিক পরিবর্তনের বিষয়। দল ও নির্বাচনকে আলাদা করা উচিত। যারা নির্বাচনে অংশ নেবে তারা দলীয় দায়িত্বে না থাকাই ভালো। নমিনেশন জনগণের মতামতের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। স্থানীয় সরকারকে দলীয় প্রতীকের বাইরে রাখার বিষয়েও ভাবা প্রয়োজন।
দৈনিক কক্সবাজার: পরিশেষে, উখিয়া-টেকনাফবাসীর উদ্দেশ্যে আপনার বিশেষ কোনো বার্তা আছে কি?
শাহজাহান চৌধুরী: আমি চাই একটি হিংসামুক্ত, সাম্যের রাজনীতি। সব সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে নিয়ে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে আমরা শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখবো। মাদক ও অনাচার পরিহার করে স্বাধীনতার চেতনায় একটি নৈতিক ও সমৃদ্ধ উখিয়া-টেকনাফ গড়তে আমি সবার সহযোগিতা কামনা করি।
দৈনিক কক্সবাজার: আমাদের এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য দৈনিক কক্সবাজার-এর পাঠক ও দৈনিক কক্সবাজার পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।
শাহজাহান চৌধুরী: আপনাদেরকেও অশেষ ধন্যবাদ- আমাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য, দৈনিক কক্সবাজারের জন্য শুভ কামনা।