বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন জেলার প্রথম মহিলা পাবলিক প্রসিকিউটর,কক্সবাজারের ইতিহাসে কোন রাজনৈতিক দলের জেলা কমিটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক, বিচারিক আদালতের চল্লিশ বছরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পর্ন সফল আইনজীবী এডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না কক্সবাজার ও বান্দরবান এলাকার জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের মহিলা সংসদ সদস্য হিসেবে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হওয়ায় ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির নবনির্বাচিত কার্যকরী কমিটি তাকে সংবর্ধনা দিয়ে নজির সৃষ্টি করেছে।
১২৫ বছর বয়সী কক্সবাজার মহকুমা আইনজীবী সমিতি পরে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতিতে ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচন প্রথা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। প্রথম নির্বাচিত সভাপতি এডভোকেট নজির আহমদ ও নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নুর আহমদ। সমমনা আইনজীবীরা বসে দুইটি প্যানেল করতেন এবং দুই প্যানেলের প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা হত। এডভোকেট নজির আহমদদের এর প্যানেল ’ডান প্যানেল’ ও এডভোকেট নুর আহমদদের প্যানেলকে ’বাম প্যানেল’ বলা হত। রাজনৈতিক বিশ্বাস অনুযায়ী ডান-বাম প্যানেল বলা হত না। যেমন এডভোকেট আবু আহমদ ছিলেন মুসলিম লীগের নেতা মহকুমার সভাপতি। তিনি বাম প্যানেল থেকে ৮১-৮৪ সাল পর্যন্ত চার বার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাকে সমর্থন দিতেন আওয়ামী লীগ,জাসদ,ন্যাপ নেতা নুর আহমদ,জহিরুল ইসলাম,মওদুদ আহমদ,পীযুষ চৌধুরীরা। ডান প্যানেলের নেতা ছিলেন এডভোকেট ছালামত উল্লাহ । তিনি জামাতে ইসলামের নেতা ছিলেন। তার প্যানেলের সবকিছু হত এডভোকেট প্রফেসর নুর আহমদের বাসায়,তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগার। ডান প্যানেল থেকে আমি ৯ বার নির্বাচন করেছি। আমি ছাত্রজীবনে করেছিলাম ছাত্রলীগ। আমি কখনও জামাত,ইসলামী ছাত্রসংঘ,শিবির করি নাই। এডভোকেট ছালামত উল্লাহ ডান প্যানেলকে কখনও জামাতীকরণ বা রাজনৈতিককরণ করার চেষ্টা করেন নাই। তিনি বক্তিগতভাবে যেমন সৎ ছিলেন,রাজনৈতিকভাবেও সৎ ছিলেন। পরে রাজনৈতিকভাবে জামাত-বিএনপি ডান প্যানেল ও আ,লীগ,জাতীয় পার্টি, জাসদ সমমনারা বাম প্যানেলে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন করেছে। জামাতের সভাপতি হলে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। বিএনপির সভাপতি হলে জামাতের সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আ,লীগ সরকার পালিয়ে যাওয়ার পর গত বছর ’মবের’ ভয়ে আ,লীগ নির্বাচন না করলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী নাম দিয়ে বোধহয় ৩জন নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৫ সালের নির্বাচনে জামাত ও বিএনপি ভিন্ন দুইটি প্যানেল করে সরাসরি নির্বাচন করে সভাপতি,সাধারণ সম্পাদকসহ বেশীর ভাগ পদে বিএনপিপন্থীরা জয়ী হন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে বিপুলভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকায় আ,লীগপন্থীরাও সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ চৌদ্দটি পদে নির্বাচন করেছেন। তাদের কেউ বাঁধা দেন নাই,কোন প্রার্থীর বাসায় পুলিশ যান নাই। আ,লীগের আমলে সভপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া জামাতপন্থী আবুল কামাল ছিদ্দিকীর বাসায় পুলিশী হামলা হয় এবং তাকে না পেয়ে তার বড় ছেলে তানভির ছিদ্দিকী পামেলকে ( এখন এডভোকেট) কোন অভিযোগ ছাড়া গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে বেশ কিছু দিন বিনা অপরাধে হাজতবাস করতে হয়েছিল। সেদিকে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ দিতে হয় আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করা বা ক্ষমতার অপববহার না করার জন্য। জামাত ও বিএনপি গতবারের ধারাবাহিকতায় আলাদা প্যানেল দেওয়ায় কক্সবাজার বারের ইতিহাসে প্রথম বারের মত তিনটি প্যানেলে নির্বাচন হওয়ায় মিডিয়ার ও জনগণের বিশেষ উৎসাহ ও আগ্রহ ছিল। এই বারের নির্বাচন সর্বোচ্চ অংশগ্রহনমূলক,গণতান্ত্রিক, শুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বহুল প্রশংসিত নির্বাচন হয়েছে । ৯৪% ভাগের অধিক আইনজীবী স্বাধীনভাবে ভোট দিয়েছেন। জাতীয় পার্টির নেতা ও গত সরকারের আমলের এপিপি সিনিয়র এডভোকেট আহমদ কবির প্রধান নিবাচন কমিশনার ও কয়েকজন আ,লীগপন্থী এবং সাধারণ আইনজীবী আইনজীবী নিয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশন সফলভাবে একটি সুন্দর উৎসবমূখর নির্বাচন আইনজীবীদের উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। ফ্যাসিস্ট বা দোসর ট্যাগ লাগিয়ে তাদের দূরে সরিয়ে না রেখে যোগ্য আইনজীবীদের উপযুক্ত কাজে লাগিয়ে বিগত নির্বাহী কমিটি প্রশংসায় ভাসছে। গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল নির্বাচন। নির্বাচনে দুইটি হাত হল জয় ও পরাজয়। প্রতিদ্বন্দ্বী সকল প্রার্থী জয়ী হতে পারে না,এক বা একাধিক প্রার্থী অবশ্যই পরাজিত হবেন। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমি পরাজিত হতে পারি,কিন্তু কোন অবস্থাতেই গণতন্ত্রকে পরাজিত হতে দেব না। এই বারের নির্বাচনে মোট ১৭টি পদের মধ্যে আ,লীগপন্থীরা জয়ী হয়েছেন ৭টি পদে, জামাতপন্থীরা ৬টি পদে, ক্ষমতাসীন বিএনপিপন্থীরা ৪টি পদে। বিগত নির্বাহী কমিটি খুব সমালোচিত হয়েছে। বিশেষ করে বার্ষিক ভোজের চরম অব্যবস্থাপনা নতুন নজির সৃষ্টি করেছে। অতীতের গ্রহনযোগ্য ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয় নাই। ভোজসভাকে কলংকিত করেছেন। সাধারণ অইনজীবীরা খুবই অসন্তোষ্ট হয়েছিলেন। তাই গত কমিটিতে থাকা আক্তার উদ্দিন হেলালী বতীত কেউ নিবাচিত হন নাই, এমন কি সাধারণ সদস্য পদেও। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সামান্য সদস্য আবদুল মান্নান সভাপতি , আবদুল্লাহ সহসভাপতি,সওকত ওসমান বিভাগীয় সম্পাদক ও আজিজুল হক জয় সদস্য নির্বাচিত হলেও জাতীয়তাবাদী বড় নেতারা সদস্য পদে নির্বাচিত হতে পারেন নাই। অন্যকে সম্মান না করলে আপনিও সম্মান পাবেন না, তা স্বাভাবিক।
রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির নবনির্বাচিত কার্যকরী পরিষদের সদস্যরা একমত হয়ে এডভোকেট শামীম আরা স্বপ্নাকে সংবর্ধনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিপুল সংখ্যক নিরপেক্ষ আইনজীবীদের ও সব রাজনৈতিক দলের সমর্থক আইনজীবীদের উপস্থিতিতে একটি সফল ও নজির সৃষ্টিকারী অভুতপূর্ব সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে প্রশংসিত হচ্ছেন। আওয়ামী লীগপন্থী,জামাতপন্থী,বিএনপিপন্থী ও নিরপেক্ষ আইনজীবীরা মনের আনন্দ ও সন্তোষ প্রকাশ করে বক্তৃতা দিয়েছেন। নিরপেক্ষ আইনজীবীরা বক্তৃতায় নবনির্বাচিত কার্যকরী পরিষদের সদস্যদের রাজনৈতিক স্বার্থপরতা,আত্মকেন্দ্রীকতা,হিনমন্যতা ও নিচতাকে সাহসের সাথে পদদলিত করে সকল আইনজীবীদের ইচ্ছা ও চাওয়া অনুযায়ী সংবর্ধনা সভার আয়োজন করায় ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সংবর্ধনার জবাবে এডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না বলেন,”আইনজীবীরা সকলে একটি পরিবার,এখানে কোন বৈষম্য নাই”। দেশে বিদেশে জনসমক্ষে বৃহত্তর আইনজীবী সমাজের একতা, মানসম্মান,ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রক্ষার স্বার্থে আইনজীবীদের কেন্দ্রীয় নেতাদের আমাদের কক্সবাজারের নির্বাচিত আইনজীবী নেতাদের যৌক্তিক ও একতা রক্ষাকারী,জনসমক্ষে আইনজীবীদের মানসম্মান ও ভাবমূর্তি উজ্জ্বলকারী পদক্ষেপ অনুসরণ করার আহ্বান জানান অনেক বক্তা। পরের দিন ২৭ এপ্রিল দৈনিক কক্সবাজারসহ অনেকগুলি পত্রিকায় উক্ত সংবর্ধনা সভার সচিত্র প্রতিবেদন গুরুত্ব সহকারে প্রথম পৃষ্টায় প্রকাশিত হয়েছে। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে শতকরা ৯৪ ভাগের অধিক আইনজীবী ভোট প্রদান করলেও দেশের সর্ববৃহৎ ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে শতকরা ৬৬জন আইনজীবী অনুপস্থিত ছিলেন বা ভোট প্রদান করেন নাই কেন? সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনেও কি দেশবাসী একই ধরনের হতাশাজনক চিত্র দেখবেন? আইনজীবী নেতারা দৃশ্যমান বেআইনী কাজ করলে দেশের আমজনতা কি করবেন?
আমাদের কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির গর্ব করার মত গৌরবের বিষয়ও অনেক আছে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এই অঞ্চল থেকে প্রথম সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এডভোকেট জহিরুল ইসলাম। পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম মন্ত্রী হয়েছিলেন মৌলভী ফরিদ আহমদ(এডভোকেট) এই বারের সদস্য। এমএলএ নির্বাচিত হয়েছিলেন এডভোকেট ফিরোজ আহমদ চৌধুরী। ১৯৭০ এর নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এডভোকেট নুর আহমদ,প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এডভোকেট জহিরুল ইসলাম। এই বারের সদস্য এডভোকেট আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ এইবার সহ তিন বার মহেষখালী-কুতুবদিয়া আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির নিয়মিত সদস্য হলেও উকালতিকে পেশা হিসেবে নেন নাই, প্রতীয়মান হয়। কক্সবাজার মহকুমা থেকে প্রথম জেলা জজ হয়েছিলেন এই বারের সদস্য আবু বকর ছিদ্দিকী। প্রথম সুপ্রীমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হয়েছিলেন এই বারের সদস্য বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী(রামু)। এখনও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি আছেন বিচারপতি মোঃ আলী (টেকনাফ)। সিআরপিসি সহ অনেকগুলি আইন বই এর বিখ্যাত লেখক এডভোকেট জহিরুল হকও (চকরিয়া) এই বারের সদস্য ছিলেন। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য এডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত কক্সবাজার-বান্দরবান আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সকল সদস্যকে সম্মানিত করেছেন। আইন চর্চার কেন্দ্রস্থল জেলার আদালতসমূহে আইনজীবী হিসেবে চল্লিশ বছরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জাতীয় সংসদে দেশ,জাতি ও জনগণের স্বার্থে আইন প্রণয়নে তিনি উল্লেখযোগ্য ভালো ভুমিকা রাখতে পারবেন বলে সকলে আশাবাদী।