সাগর উত্তাল, বহাল রয়েছে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত। এরই মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে বিশাল বিশাল ঢেউয়ের সঙ্গে আনন্দে মেতেছেন ভ্রমণপিপাসুরা। উত্তাল সাগরের ঢেউ যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের উচ্ছ্বাস। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তায় সমুদ্রস্নানে সতর্ক অবস্থানে লাইফগার্ড কর্মীরা। আর পর্যটকের বাড়তি চাপ ঘিরে সৈকতপাড়ের ব্যবসায়ীদের মুখেও ফুটেছে হাসি।
গেল দুদিনের টানা ভারী বৃষ্টির পর শুক্রবার দেখা মিলেছে ঝলমলে সূর্যের। সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটির দিন-সব মিলিয়ে আবহাওয়া যেন একেবারেই পর্যটকবান্ধব। তাই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে সকাল থেকেই ভিড় বাড়তে থাকে। চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ।
উত্তাল সাগরের ঢেউ, পর্যটকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর সৈকতপাড়ের ব্যস্ততায় শুক্রবার যেন ফিরে পেয়েছে চিরচেনা রূপ। বিশাল ঢেউয়ের সঙ্গে আনন্দে মেতেছেন ভ্রমণপিপাসুরা। ঢেউয়ের তীব্রতা যত বাড়ছে, পর্যটকদের উচ্ছ্বাসও যেন ততই বাড়ছে। কেউ নেমেছেন সমুদ্রের জলে, কেউ আবার বালুচরে উপভোগ করছেন সাগরের সৌন্দর্য।
পর্যটক আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমার সমুদ্র খুব পছন্দ। শুক্রবার কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল নেমেছে। আমি এর আগে অনেকবার কক্সবাজারে এসেছি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এবার সমুদ্রের ঢেউ সবচেয়ে বেশি উত্তাল। একই সঙ্গে সমুদ্রের গর্জনও অনেক বেশি শোনা যাচ্ছে।’
রিসিতা জাহান বলেন, ‘সাগর পছন্দ, তাই তো কক্সবাজারে ঘুরতে আসা। আমাদের দেশে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে অবস্থিত-এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। সব মিলিয়ে কক্সবাজারে এসে ভালোই লাগছে। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। আমার মনে হয়, এ বিষয়ে সরকারের আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে সতর্ক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
হুমায়ুন করিব বলেন, ‘সাগরের ঢেউ এখন বেশ উত্তাল। আমরা এখানে বসেও বেশ আনন্দ উপভোগ করছি। তবে ঢেউ বেশি থাকায় বাচ্চাদের নিয়ে সাগরে নামা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা বড়রা পানিতে নামতে পারলেও শিশুদের নিয়ে নামার মতো পরিস্থিতি নেই। তবুও সাগরের উত্তাল ঢেউ ও গর্জন উপভোগ করে আলহামদুলিল্লাহ, আমরা বেশ আনন্দ পাচ্ছি।’
এদিকে, ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল থাকায় সৈকতের প্রতিটি পয়েন্টে টাঙানো হয়েছে লাল পতাকা। একই সঙ্গে টহল জোরদার করেছে লাইফগার্ড কর্মীরা। আর মাইকিং করে পর্যটকদের সচেতন করছে স্বেচ্ছাসেবকরা।
কক্সবাজারস্থ সিআইপিআরবির কমিউনিটি এডুকেটর নাছিমা আক্তার বলেন, ‘পর্যটকদের প্রতি আমাদের পরামর্শ হলো—তারা যেন সবসময় লাইফগার্ডের নির্ধারিত এলাকায় গোসল করেন। সাঁতার কাটার সময় হাঁটুপানির বেশি গভীরে না যাওয়াই নিরাপদ। একই সঙ্গে শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে এবং সবসময় নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তাদের দেখভাল করতে হবে। পানিতে নামার আগে অবশ্যই আবহাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি ও জোয়ার-ভাটার অবস্থা সম্পর্কে জেনে নেওয়া উচিত। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের লাইফগার্ডরা সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত রয়েছেন। প্রয়োজন হলে পর্যটকরা যেকোনো সময় লাইফগার্ডদের সহযোগিতা নিতে পারেন।’
সী সেফ লাইফগার্ড সংস্থার ইনচার্জ জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘বর্তমানে সমুদ্র বেশ উত্তাল এবং তিন নম্বর সতর্কসংকেত চলছে। এর মধ্যেও প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটেছে এবং অনেক পর্যটক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সমুদ্রে নেমে পড়ছেন। পর্যটকদের সতর্ক করতে বিভিন্ন স্থানে লাল পতাকা টানানো হয়েছে। পাশাপাশি মাইকিং করে তাদের পানিতে না নামার জন্য সতর্ক করা হচ্ছে। তবে সতর্ক করার পরও অনেক পর্যটক পানিতে নেমে যাচ্ছেন। এ কারণে ব্যস্ত সময়ে পর্যটকদের নিয়ন্ত্রণ করতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত সংখ্যক লাইফগার্ড ও প্রয়োজনীয় উন্নতমানের সরঞ্জামের সংকট থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
অন্যদিকে, পর্যটকের ঢলে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সৈকতপাড়ের ব্যবসা-বাণিজ্যে। দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে পর্যটকদের আনাগোনায় মুখে হাসি ফুটেছে সৈকতপাড়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
সুগন্ধা পয়েন্টের পার্ল ব্যবসায়ী মো. কামাল বলেন, ‘সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় পর্যটকদের বেশ ভালো সমাগম হয়েছে। পর্যটকদের উপস্থিতিতে বেচাকেনাও ভালো হচ্ছে। সকাল থেকে দোকান খোলার পর বেলা ১১টা পর্যন্ত প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে। আশা করছি, সন্ধ্যার দিকে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়লে বিক্রিও আরও ভালো হবে।’
বার্মিজ পণ্যের দোকানদার নজির আহমদ বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য মোটামুটি ভালোই যাচ্ছে। বর্তমানে পর্যটকের সংখ্যাও কিছুটা বেড়েছে। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় বেচাকেনাও মোটামুটি ভালো হচ্ছে।’
কক্সবাজারে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং যেকোনো ধরনের হয়রানি রোধে তৎপর রয়েছে প্রশাসন।