ভালো জীবনের স্বপ্ন-কিন্তু শেষ গন্তব্য মৃত্যু কিংবা নিখোঁজের অন্ধকার। মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে একের পর এক রোহিঙ্গা হারিয়ে যাচ্ছেন সমুদ্রপথে। অভিযোগ, ক্যাম্পের দালালরা তাদের মিয়ানমারের চামেলিতে বিক্রি করে, মুক্তিপণের নামে আদায় করে লাখ লাখ টাকা, এরপর তুলে দেয় মালয়েশিয়াগামী মৃত্যুফাঁদের ট্রলারে। ইউএনএইচসিআর বলছে, এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সমুদ্রপথ। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও হতাশাকে পুঁজি করেই সক্রিয় আন্তর্জাতিক পাচারচক্র।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এখন অপেক্ষা শুধু স্বজন ফিরে আসার। কারও চোখে সন্তান হারানোর ভয়, কারও হাতে দালালদের পাঠানো ভয়েস মেসেজ। ১৫ বছর বয়সী এনায়েত উল্লাহ। কাস্টমস এলাকায় খেলতে যাওয়ার কথা বলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় টেকনাফে। পরিবারের অভিযোগ, হাকিমপাড়া এলাকার সলিম নামের এক ব্যক্তি কৌশলে তাকে দালালদের হাতে তুলে দেয়।
এনায়েতের বাবার অভিযোগ, টেকনাফের একটি গুদামে নয় দিন আটকে রাখার পর তাকে মিয়ানমারের চামেলি এলাকায় পাঠানো হয়। সেখানে তাকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছেন তিনি। এরপর শুরু হয় আরেক অনিশ্চয়তা। দালালদের কাছ থেকে আসে নানা ধরনের তথ্য। কখনো বলা হয়, তাকে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়েছে। আবার কখনো জানানো হয়, সে আর বেঁচে নেই।
এনায়েত উল্লাহ’র বাবা এনায়েত হোসেন (৪৩) অভিযোগ করে বলেন, 'কাস্টমস এলাকায় খেলতে যাওয়ার সময় হাকিমপাড়া এলাকার সলিম আমার ছেলেকে কৌশলে টেকনাফে নিয়ে গিয়ে একটি গুদামে বিক্রি করে দেয়। বিক্রির পর টানা নয় দিন তাকে টেকনাফের ওই গুদামে আটকে রাখা হয়। পরে তাকে মিয়ানমারের চামেলি এলাকায় পাঠানো হয়। আমার ছেলেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় জড়িত কয়েকজন দালাল নিজেদের মধ্যে ৫০ হাজার টাকা করে ভাগ করে নেয়।'
তিনি আরও বলেন, 'গত চার দিন ধরে দালালরা আমাকে মোবাইলে ভয়েস মেসেজ পাঠাচ্ছে। তারা জানিয়েছে, প্রথমে ২৮০ জন যাত্রী নিয়ে যে ট্রলারটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা দেয়, সেই ট্রলারেই আমার ছেলেকে তুলে দেওয়া হয়েছিল। এখন তারা বলছে, আমার ছেলে মারা গেছে। কিন্তু তার বিষয়ে কোনো নিশ্চিত খবর পাচ্ছি না। এমনকি দালালরা আমাকে বলেছে, চাইলে আমার ছেলের ফাতেহা দিয়ে দিতে পারি।'
এনায়েত উল্লাহর মতো একই পরিণতি ১৫ বছর বয়সী জানে আলমেরও। পরিবারের অভিযোগ, ক্যাম্প থেকে তাকে টেকনাফে নিয়ে গিয়ে দালালদের কাছে বিক্রি করা হয়। পরে তাকে নেওয়া হয় মিয়ানমারের চামেলি এলাকায়।
জানে আলমের বাবা আব্দুল নুর জানান, ছেলেকে ফেরত দেওয়ার কথা বলে দালালরা একাধিকবার টাকা নেয়। প্রথমে দেড় লাখ টাকা, পরে আরও কয়েক দফায় টাকা পাঠানো হয়। এমনকি ছেলের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ার জন্যও টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও ফিরে আসেনি সন্তান।
জানে আলমের বাবা আব্দুল নুর (৫৫) অভিযোগ করে বলেন, 'ক্যাম্প থেকে আমার ছেলেকে টেকনাফে নিয়ে গিয়ে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে তারা তাকে মিয়ানমারের চামেলি এলাকায় নিয়ে যায়। চার দিন পর দালালরা ফোন করে জানায়, আমার ছেলে তাদের কাছে আছে। ছেলেকে ফেরত নিতে চাইলে টাকা পাঠাতে হবে বলে তারা জানায়। এমনকি ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দেওয়ার জন্যও টাকা দাবি করে।
তিনি বলেন, 'প্রথমে দেড় লাখ টাকা দিই। এরপর দালালরা জানায়, সীমান্ত বন্ধ থাকায় ছেলেকে আর ক্যাম্পে পাঠানো সম্ভব হয়নি। পরে তারা আবার টাকা দাবি করে। ১০-১৫ দিন পর ধার করে ১৫ হাজার টাকা পাঠাই। এরপরও ছেলেকে ফেরত দেয়নি। পরে আবার আরও ১৫ হাজার টাকা পাঠাই, তবুও কোনো ফল হয়নি। একপর্যায়ে দালাল তাদের মা-বাবাকে আমাদের কাছে পাঠায়। তাদের হাতেও ৪৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও আমার ছেলেকে ফেরত পাইনি।
তিনি আরও বলেন, 'ঈদুল আজহার প্রায় ২৫ দিন পর দালালরা জানায়, আমার ছেলেকে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাইনি। দালালরা এখন ছেলেকে খুঁজতে গেলে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। প্রায় এক মাস আগে তারা শেষবারের মতো আমার ছেলের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ট্রলারডুবির ঘটনার পর থেকে আমার ছেলের আর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।'
এদিকে ট্রলারডুবির ঘটনার পর নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারগুলো এখন নতুন আতঙ্কে। অভিযোগ, দালালদের কাছে সন্তানদের বিষয়ে জানতে চাইলে উল্টো দেওয়া হচ্ছে প্রাণনাশের হুমকি।
জানে আলমের মা লালু (৪০) বলেন, 'সন্তানের সন্ধান চাইতে গেলে দালালরা আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও গালিগালাজ করছে। কাউকে বিষয়টি জানালে বা অভিযোগ করলে ক্যাম্পে এসে পুরো পরিবারকে হত্যা করার হুমকিও দিচ্ছে তারা। এমন পরিস্থিতিতে আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। কখন দালাল চক্র এসে পরিবারের কারও ক্ষতি করবে, সেই ভয় সবসময় তাড়া করছে। এই অবস্থায় ক্যাম্পে কীভাবে নিরাপদে থাকব, তা নিয়েই আমরা উদ্বিগ্ন।'
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে যাত্রা করেছেন। তাদের বড় একটি অংশ সমুদ্রে নিখোঁজ হয়েছেন বা প্রাণ হারিয়েছেন।
ইউএনএইচসিআরের যোগাযোগ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, এ সময়ে ৬,৫০০–এর বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বিপদসংকুল সমুদ্রপথে যাত্রা করেছিলেন। তাদের মধ্যে প্রতি সাতজনের একজন সমুদ্রে নিখোঁজ হয়েছেন বা প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে এই রুটটি বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সমুদ্রপথে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে চরম হতাশা এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেয়ে ভালো জীবনের আশায় অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন।
মোশাররফ হোসেন আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বললে তারা বারবার নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানান। তবে ২০২৪ সালের পর নতুন করে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বর্ণনায় স্পষ্ট হয়েছে, সেখানে পরিস্থিতি এখনো প্রত্যাবাসনের উপযোগী নয়। তাই স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের যে লক্ষ্য, তা এখনো বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, মানবপাচারে সক্রিয় রয়েছে একাধিক চক্র, যার মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক দালালরা অন্যতম। আর শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের মতে, সমুদ্রপথে অবৈধ যাত্রা বর্ষা মৌসুমে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, মানবপাচারের সঙ্গে মূলত দুই ধরনের চক্র জড়িত। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক চক্রগুলো সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এসব চক্রের সদস্যরা সাধারণত ক্যাম্পের ভেতরেই অবস্থান করে এবং সেখান থেকেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।
তিনি বলেন, যারা সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তাদের জোর করে নয়; বরং নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে রাজি করানো হয়। ভালো জীবনের আশ্বাস দিয়ে দালালরা তাদের কৌশলে ফাঁদে ফেলে। ফলে ভুক্তভোগীরা কোথাও অভিযোগ করেন না-না ক্যাম্পের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে, না থানায়।
তিনি আরও বলেন, পরে যখন দুর্ঘটনা ঘটে বা কেউ নিখোঁজ হন, তখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য থাকে না। কারণ যাত্রার আগে কেউ বিষয়টি জানায় না এবং কোথায় বা কীভাবে ঘটনা ঘটেছে, সে সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। এতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া বা দায়ীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অহিদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশি কোনো নাগরিক অপহরণ বা পাচারের শিকার হলে সাধারণত পরিবারের সদস্যরা থানায় অভিযোগ করেন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ খুব কমই আসে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিষয়েও বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও উখিয়া বা টেকনাফ থানায় কিংবা রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে কোনো নিখোঁজ বা মানবপাচার-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
তিনি জানান, সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কিছু যুবক এবং মিয়ানমারে অবস্থানরত রোহিঙ্গারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগ না থাকায় আইনগতভাবে নির্দিষ্ট মামলা দায়ের বা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন।
তিনি বলেন, মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও চক্রগুলোর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে টেকনাফ, উখিয়া ও রামু থানার পুলিশকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনোভাবেই মানবপাচারের ঘটনা ঘটতে না পারে। সম্ভাব্য আস্তানা ও পাচারকারীদের অবস্থান চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, মানবপাচারের ঘটনায় থানায় মামলা হলে পুলিশ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আর শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের সচেতন করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বোঝানো হয় যে, সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এতে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এ ধরনের যাত্রা আরও বেশি বিপজ্জনক। অতীতে বর্ষাকালে এভাবে সমুদ্রপথে যাওয়ার ঘটনা খুব একটা শোনা যায়নি।
মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এ কাজে কমিশনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পুলিশ ও বিভিন্ন এনজিওও অংশ নিচ্ছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন সমন্বয় সভা ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যাতে রোহিঙ্গারা মানবপাচারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হন।
তবে তিনি মনে করেন, সমস্যার মূল কারণ রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও হতাশা। প্রায় নয় বছর ধরে তারা বাংলাদেশে অবস্থান করলেও নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেননি। ক্যাম্পের অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে উন্নত জীবনের আশায় অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তিনি আরও বলেন, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মানবপাচারকারী চক্র নানা ধরনের প্রতারণার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রলুব্ধ করছে। এসব চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে এটি শুধু বাংলাদেশের কোনো স্থানীয় দালাল চক্রের কাজ নয়; এর সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রও জড়িত। এ ধরনের আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমন্বয় ও সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ইউএনএইচসিআর ও আইওএমের যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, মিয়ানমার উপকূলে জুনের শেষ ও ৮ জুলাই রোহিঙ্গাবাহী দুটি নৌকাডুবিতে পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।