কক্সবাজার, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর। একদিকে সাগরের নীল জল, অন্যদিকে পাহাড়ের সবুজ ঢাল। কিন্তু এই প্রকৃতির সৌন্দর্যের আড়ালেই গড়ে উঠেছে এক নীরব, দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়, পাহাড়ের বুকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, যা প্রতি বর্ষায় পরিণত হয় মৃত্যুর সুড়ঙ্গে।
সাম্প্রতিক টানা ভারী বর্ষণ আবারও সেই বিপদের ভয়াবহতা সামনে এনে দিয়েছে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে পাহাড়ধসে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৮ জনই রোহিঙ্গা। সর্বশেষ মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ২ টার দিকে কক্সবাজারের সদরের দরিয়ানগরের বড়ছড়াপাড়ায় গাছ সহ পাহাড় ধ্বসে মাটি চাপায় মারা যান নাছিমা আকতার লিমা (২৭) নামের এক নারী।
এ ঘটনায় নিহত লিমার স্বামী জসিম উদ্দিনকে আহতাবস্থায় কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য (মেম্বার) মোহাম্মদ ইউনুছ।
প্রতিবেশিদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, স্বামী-স্ত্রী দুপুরের খাবার পর ঘরের ভেতর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এসময় বাড়ির পেছনের পাহাড় থেকে একটি বড় গাছ সহ ধসে মাটি চাপা পড়ে। চিৎকার শুনে স্থানীয়রা মাটি সরিয়ে স্বামী-স্ত্রীকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক একজনকে মৃত ঘোষণা দেন।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, সোমবার বৃষ্টি ছিল ১২৯ মিলিমিটার। মঙ্গলবার সকাল ৬ টা থেকে বিকাল ৩ পর্যন্ত ৯ ঘন্টায় মোট ৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আরো আছে।
তিনি জানান, মঙ্গলবার বৃষ্টির মূল পয়েন্ট-হটস্পট চট্টগ্রাম। কক্সবাজারেও হচ্ছে। তবে কুতুবদিয়া, চকরিয়া, চট্টগ্রামে বৃষ্টি বেশি। এছাড়া অন্যান্য উপকূলীয় এলাকাতেও বৃষ্টিপাত অব্যাহত আছে।
এর আগে সোমবার পাহাড় ধ্বসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮ জন, কক্সবাজার শহর ও পেকুয়া একজন করে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বৃষ্টিতে পানিতে ডুবে এক রোহিঙ্গা সহ ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
# প্রাকৃতিক দুর্যোগ নাকি মানবসৃষ্ট বিপর্যয়? :
পাহাড় ধসে প্রাণহানির পর প্রশ্ন উঠেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ নাকি মানবসৃষ্ট বিপর্যয়? কারণ কক্সবাজারে পাহাড়ধস নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে একই চিত্র দেখা যায়, রাতে ঘুমন্ত মানুষের ওপর ধসে পড়ে পাহাড়, নিভে যায় পুরো পরিবার।
তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই বিপর্যয়ের পেছনে কেবল প্রাকৃতিক কারণ দায়ী নয়। বরং এটি দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ন, পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থার সম্মিলিত ফল।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটের পর উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলে ব্যাপক হারে বনভূমি উজাড় করা হয়। হাজার হাজার একর পাহাড় কেটে তৈরি করা হয় আশ্রয়শিবির। এতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন ভেঙে পড়ে, মাটির বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠে নিম্নআয়ের মানুষের বসতি।
কক্সবাজার জেলার পাহাড়ি অঞ্চলগুলো এখন কার্যত একটি ‘রেড জোন’। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ২০ হাজার স্থানীয় পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাস করছে। অন্যদিকে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে অন্তত ১ লাখ সরাসরি ভূমিধসের ঝুঁকিতে।
কক্সবাজার শহরের লাইটহাউস, ছাত্তার ঘোনা, পাহাড়তলী, সার্কিট হাউস এলাকা—সবখানেই একই দৃশ্য। খাড়া ঢালে মাটি কেটে বানানো ছোট ছোট ঘর, যেগুলো একেকটি সম্ভাব্য মৃত্যুকূপ।
উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বাঁশ ও ত্রিপলের তৈরি ঘরগুলো দাঁড়িয়ে আছে নরম মাটির ওপর, যেখানে ভারী বৃষ্টি হলেই মাটি সরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পাহাড়ের জমি দখল এবং বসতি গড়ে তোলার পেছনে রয়েছে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটে যুক্ত রয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তি, ভূমিদস্যু এবং কিছু অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
প্রক্রিয়াটি সাধারণত এমন—প্রথমে সরকারি বনভূমি বা খাস জমি দখল করা হয়। এরপর পাহাড় কেটে সমতল করে সেখানে ছোট ছোট ঘর তৈরি করা হয়। এসব ঘর মাসিক ২ থেকে ৪ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। কম আয়ের মানুষদের জন্য এটি শহরের কাছে থাকার একটি ‘সহজ সমাধান’, যদিও তা প্রাণঘাতী।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অবৈধ বসতিগুলোতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও দেওয়া হয় অবৈধভাবে, যা সিন্ডিকেটের আয় আরও বাড়িয়ে দেয়।
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবীরা মাইকিং করে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবে এই উদ্যোগের কার্যকারিতা সীমিত।
অনেকেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেন। কারণ তাদের কাছে ঘরবাড়ি হারানোর ভয়, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এবং বিকল্প আশ্রয়ের অভাব—এই তিনটি বিষয়ই বড় হয়ে ওঠে।
একজন স্বেচ্ছাসেবকের ভাষায়, 'মানুষ জানে ঝুঁকি আছে, কিন্তু যাওয়ার জায়গা নেই।'
মঙ্গলবার পাহাড় ধসের ঘটনার পর পরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান সহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, গতকাল (সোমবার) দিনব্যাপী পাহাড়ের পাশে বসবাসকারিদের দ্রুত সরে যেতে নানাভাবে প্রচার-মাইকিং করা হয়। পাহাড়ের ধ্বসের এলাকাটিতে কয়েকবার প্রচার চালিয়েছে নিহতের পরিবার সহ অন্যান্যদের সরে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তা শুনছেন না কেউ। এখন হয়তো বলপ্রয়োগ বা আইন প্রয়োগ করে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারিদের সরিয়ে নিতে হবে।
ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজার স্টেশনের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য্যও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সোমবার বিকাল নিহতদের পরিবারটিতে ডেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু সরে যাবে বলে যাননি। মঙ্গলবারও বিভিন্ন এলাকায় ফায়ার সার্ভিস মাইকিং অব্যাহত রেখেছে।