আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা
নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়,বরং এটি সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা শিক্ষার হার বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সৎ, নৈতিক, মানবিক, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক নাগরিক।
একটি দেশের জনগণের মধ্যে রাজনীতির প্রতি অনীহা তৈরি হলে তা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। মানুষ যখন ভোট, জনআলোচনা ও নাগরিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যায়, তখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর জনগণের জবাবদিহিতা কমে যায়। এর ফলে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ বাড়তে পারে। অন্যায় দেখেও সচেতন মানুষ চুপ থাকে।
একইভাবে, একটি দেশের যুবসমাজ যদি নৈতিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু সমাজের ওপর নয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের ওপরও পড়ে। নৈতিকতার অবক্ষয় থেকে অপরাধ, মাদকাসক্তি, দুর্নীতি, সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও সহমর্মিতা কমে যায় এবং পরিবার ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,আজকের যুবসমাজই আগামী দিনের নেতৃত্ব। তাই তারা যদি সততা, ন্যায়বোধ, মানবিকতা, দায়িত্বশীলতা, পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ ও দেশপ্রেমের মতো মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বও দুর্বল ও স্বার্থকেন্দ্রিক হয়ে পড়তে পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে আমাদের সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ক্রমশ একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা, শিষ্টাচার, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অবক্ষয় দৃশ্যমান। ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসহিষ্ণুতা, প্রতারণা, দুর্নীতি ও সামাজিক অস্থিরতা সমাজের বিভিন্ন স্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নেতিবাচক প্রবণতার প্রভাব প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে দৃশ্যমান। শিশুরা পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবেশ থেকেই মূল্যবোধের শিক্ষা গ্রহণ করে। তাই বড়দের আচরণ, সামাজিক পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে প্রচলিত সংস্কৃতি তাদের মানসিকতা ও ভবিষ্যৎ চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।
শুধু পাঠ্যবইয়ে নৈতিক শিক্ষার কয়েকটি অধ্যায় সংযোজন করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। নৈতিক শিক্ষা হতে হবে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং আচরণে প্রতিফলিত। পরিবারে সন্তানদের সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি শিষ্টাচার, সহনশীলতা, মানবিকতা, সামাজিক দায়িত্ব এবং নৈতিক নেতৃত্বের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আচরণেও নৈতিকতার বাস্তব উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কারণ শিশুরা শুধু উপদেশ থেকে নয়, বরং চারপাশের মানুষের আচরণ দেখেও শিক্ষা গ্রহণ করে।
নৈতিক অবক্ষয় রোধে একটি সুপরিকল্পিত, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই পরিকল্পনায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। শিশু ও তরুণদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আইন মেনে চলা, দুর্নীতিবিরোধী মানসিকতা এবং দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি প্রজন্ম যদি নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের সব অর্জনই দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ নৈতিকতা ছাড়া জ্ঞান বিপজ্জনক হতে পারে, ক্ষমতা স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হতে পারে এবং উন্নয়ন বৈষম্য ও অনিয়মকে আরও গভীর করতে পারে।
অন্যদিকে, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিকরাই একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে পারে। তাই এখনই সময় নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার।
প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত নৈতিক আচরণ, সততা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি একটি নৈতিক, মানবিক ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে উঠবে।
তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করা শুধু শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব নয়,এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।