আবু মোরশেদ চৌধুরী
রাষ্ট্র পরিচালনা একটি জটিল ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে উন্নয়নশীল কিংবা স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে একই সঙ্গে অর্থনীতি, রাজনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি ও সামাজিক উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজন দক্ষ, সুশিক্ষিত, অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্বের পরামর্শ।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব দেশে সব সময় প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ ও অভিজ্ঞ দেশীয় পরামর্শক পাওয়া যায় না। কোনো কোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশীয় মেধার ঘাটতি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে দুর্বল করে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ‘মেধা আমদানি’ বা আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক হিসেবে যুক্ত করার ধারণা একটি সময়োপযোগী বিকল্প হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের অর্থনীতি, কূটনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, প্রশাসন ও নীতি প্রণয়নে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কাজে লাগিয়ে থাকে। আমাদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মেয়াদ, সুস্পষ্ট দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার আওতায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ কিংবা প্রবাসী বাংলাদেশি মেধাবীদের রাষ্ট্রীয় পরামর্শক হিসেবে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
সিদ্ধান্ত নয়, পরামর্শ দেবেন বিশেষজ্ঞরা,
তবে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি, বিদেশি বা আন্তর্জাতিক পরামর্শক কখনোই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প হতে পারেন না। তাঁদের ভূমিকা হবে নীতিনির্ধারকদের সহায়তা করা।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত, বৈশ্বিক বাস্তবতা ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁরা সরকারের সামনে সম্ভাব্য পথ ও বিকল্প তুলে ধরতে পারেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থাকবে রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকার ও সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের হাতে।
একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের বিষয়গুলো কঠোরভাবে বিবেচনা করতে হবে। পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রবাসী মেধাবীদের কাজে লাগানোর সুযোগ
এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হতে পারে প্রবাসী বাংলাদেশি মেধাবীরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের অসংখ্য নাগরিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন, নিরাপত্তা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করছেন।
তাঁদের অনেকের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা যেমন রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কেও রয়েছে গভীর ধারণা। ফলে জাতীয় উন্নয়ন ও নীতি প্রণয়নে তাঁদের অভিজ্ঞতাকে উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে কাজে লাগানো যেতে পারে।
মেধার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। একজন যোগ্য বাংলাদেশি দেশের বাইরে থাকলেও তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দেশের সম্পদ হতে পারে। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই মেধাকে খুঁজে বের করা এবং জাতীয় স্বার্থে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।
‘মেধা আমদানি’ হবে সাময়িক, লক্ষ্য হবে নিজস্ব সক্ষমতা
তবে বিদেশি মেধার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ‘মেধা আমদানি’র মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দেশের নিজস্ব মেধা, গবেষণা, নীতি-প্রণয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করা।
অর্থাৎ বিদেশি বিশেষজ্ঞরা পথ দেখাতে পারেন, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন এবং নতুন চিন্তার দ্বার খুলে দিতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও মেধাবীদের মধ্যে স্থানান্তরিত হতে হবে।
দলীয় আনুগত্য নয়, যোগ্যতাই হোক মানদণ্ড
রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া। সেখানে দলীয় আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা, অন্ধ সমর্থনের চেয়ে যুক্তি এবং ব্যক্তি-কেন্দ্রিকতার চেয়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সরকারের পরামর্শক বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন ব্যক্তিদের প্রয়োজন, যাঁদের শুধু একাডেমিক যোগ্যতা নয়, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বাস্তব জ্ঞান, নৈতিকতা, সততা, স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা এবং ব্যক্তিত্বের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক শ্রদ্ধা রয়েছে।
সংকটকে সুযোগে রূপান্তরের ভাবনা
বর্তমান বিশ্বে কোনো রাষ্ট্র একা নয়। অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, অভিবাসন, নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সবকিছুই এখন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তাই প্রয়োজন হলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা সেরা মেধা ও অভিজ্ঞতাকে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগানো যেতে পারে। এটি কোনো দেশের অক্ষমতার স্বীকারোক্তি নয়, বরং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারকে কাজে লাগানোর বাস্তববাদী ও দূরদর্শী কৌশল।
শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য একটাই যোগ্য মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং জাতীয় স্বার্থকে আরও শক্তিশালী করা।
সংকটের সময়ে ‘মেধা আমদানি’ তাই দুর্বলতার প্রতীক নয়, বরং হতে পারে একটি সাহসী, বাস্তববাদী ও সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।