বিএনপি সরকারের গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; জ্যেষ্ঠতম মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রেক্ষাপটে আসা এই রদবদলে নির্বাহী দায়িত্বে তিনি আনলেন নতুন ছয় মুখ।
নির্বাহী বিভাগের পুনর্গঠনে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে বাদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী; তাকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতাকে দপ্তর পাল্টে তার জায়গায় পদোন্নতি দিয়ে আনা হয়েছে রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে; এতদিন ওই মন্ত্রণালয়ে রিতার জুনিয়র মন্ত্রী ছিলেন তিনি। প্রায় দুই দশক বিরতির পর বেশিরভাগ নতুন মুখ নিয়ে আসা বিএনপি সরকারের জন্য এমন পরিবর্তনকে স্বাভাবিকই মানছেন বিশ্লেষকরা।
আবার কারও কাছে মাত্র ছয় মাসে এই রদবদল ‘অবাক করা’। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার। সেদিন প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৫ জন মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন।
মন্ত্রীদের মধ্যে হাফিজ উদ্দিন আহমদ পরে স্পিকারের দায়িত্ব পান। আর প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে কায়সার কামাল গত মার্চে ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব পান।
হাফিজ উদ্দিনের জায়গায় মন্ত্রিসভায় আসেন আহমেদ আযম খান। আর ১ জুন পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিতে যাওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর পদও শূন্য হয়। আর শুক্রবারের রদবদলে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়লেন জহির উদ্দিন স্বপন।
ফলে সব মিলিয়ে তারেক রহমানের সরকারে মন্ত্রীর সংখ্যা হল ২৬ জন, আর প্রতিমন্ত্রী থাকলেন ২৪ জন।
এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর ১০ জন উপদেষ্টা ছিলেন। তাদের পাঁচজন মন্ত্রী এবং পাঁচজন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
তাদের মধ্যে হুমায়ুন কবির প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় এবং জহির উদ্দিন স্বপন মন্ত্রী থেকে উপদেষ্টা হওয়ায় উপদেষ্টাদের মোট সংখ্যায় কোনো পরিবর্তন হল না।
৫১ জন সদস্য নিয়ে মন্ত্রিসভার এই পুনর্গঠনকে কুঁড়েঘরের ‘খুঁটি পাল্টানোর’ সঙ্গে তুলনা করেছেন সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার।
ছয় মাসের কাজ দেখে দায়িত্বে এমন পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে এই বিশ্লেষক বলেন, “প্রধানমন্ত্রী একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন বলা যায়। আবার তার মন্ত্রিসভায় অধিকাংশই ছিলেন নতুন মুখ। এখন তিনি কাজ দেখলেন, নাড়াচাড়া করে দেখে খুঁটিতো বদলাতে হয়।”
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একানব্বইয়ের সরকারের শুরু দিকেও মন্ত্রিসভায় এমন পরিবর্তন আসার কথা তুলে ধরে সাবেক এই সচিব বলেন, “দীর্ঘ বিরতির পর কোনো দল ক্ষমতায় এলে এটা স্বাভাবিকভাবে করতে হয়।
“কারণ, আগে সরকারে থাকা সিনিয়র অনেক নেতা মারা যান এবং কেউ কেউ বার্ধ্যক্যজনিত কারণে কর্মক্ষম থাকেন না।”
তবে, আরেক বিশ্লেষক অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেছেন, “রদবদল তো সবসময় মন্ত্রিসভায় হয়। তবে ছয় মাসের মধ্যে রদবদল হয়তো মানুষকে একটু অবাক করে দিয়েছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে ছয় মাসের মধ্যেই যে বিষয়টি হচ্ছে সরকার এবং বিএনপি দল অনেকটাই কাছাকাছি চলে আসছে। যে কারণে রাজনীতির দল হিসেবে বিএনপির আলাদা যে গুরুত্ব, আলাদা যে অবস্থান সেটি বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
“বিলীন হওয়ার কারণে যেটা হচ্ছে যে নতুন সদস্যদের মন্ত্রীর জায়গায় অন্তর্ভুক্তি এবং এখন পর্যন্ত আপনার, আমরা দেখেছি যে হয়তো আরো সামনে মন্ত্রিপরিষদে নতুন অন্তর্ভুক্ত হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “এখন বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ থেকে অন্তর্ভুক্তিগুলো করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে দলের যারা তরুণ তারাও আছেন, আবার যারা অভিজ্ঞ, তারাও আছেন।
“তো একটি হল যে সমন্বয়, আরেকটি হল আমার কাছে মনে হচ্ছে যে এক ধরনের বিএনপির অভ্যন্তরের রাজনীতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং দল ও সরকার দুটোর মধ্যে একটা সমঝোতা করার চেষ্টা। পাশাপাশি নানারকম চাপ থাকতে পারে।”
কার ভাগে কোন মন্ত্রণালয়
তারেক রহমানের সরকারে যুক্ত হয়েছেন চারজন নতুন মন্ত্রী, তাদের একজন আগে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। আর নতুন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন দুজন, তাদের একজন আগে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ এবং বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
আর প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর পরপরই তিনি চারজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রীকে শপথ পড়ান।
রাতেই তাদের দপ্তর বণ্টনের তথ্য দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। পরে জারি করা হয় প্রজ্ঞাপন।
মির্জা ফখরুলের ছেড়ে আসা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির প্রবীণ নেতা আবদুল মঈন খান। তিনি নরসিংদী-২ আসনের এমপি।
খালেদা জিয়ার ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের সরকারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন মঈন খান। পরে ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সরকারে প্রথমে তথ্য এবং পরে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ছিলন।
আন্দালিভ রহমান পার্থ বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ভোট করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে।
গত আড়াই মাস ধরে খালি থাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য সাচিং প্রু জেরী।
এর আগে ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনেও তিনি এমপি হয়েছিলেন। বান্দরবান সদর উপজেলা ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও সামলেছেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি পাওয়া রশিদুজ্জামান মিল্লাত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়েরই মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। আর বর্তমান মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয়েছে।
নতুন প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। এই মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ।
আর প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে আসা হুমায়ুন কবিরকে পরররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে।
কিন্তু ওই মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, “এক মন্ত্রণালয়ে দুইজন প্রতিমন্ত্রী থাকলে তো অসুবিধা নেই।”
একই মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী থাকলে কোনো অসুবিধা না থাকার কথা বলেছেন সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদারও।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠতার ক্রম, কে কোথায় যাবেন, কোন মন্ত্রণালয়ে কতজন প্রতিমন্ত্রী থাকবেন- এগুলো একেবারেই এবং পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। এখানে কার্যবিধিমালার কোনো ব্যত্যয় হবে বলে মনে হয় না।
পরিবর্তনে ইঙ্গিত কী
নতুনদের দিয়ে শুরু করা সরকারে মন্ত্রীদের ‘পারফরমেন্স’ দেখে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করা হয়েছে বলে মনে করছেন সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার।
তিনি বলেন, “প্রধামন্ত্রী তারেক রহমান সরকারে একেবারে নতুন এবং দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। সরকার গঠনের পরপরই তিনি বিভিন্ন আলোচনায় কিন্তু বলেছেন, মন্ত্রীদেরও ‘পারফরমেন্স’ বিবেচনা করে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।
“আর মন্ত্রিসভায় যারা এসেছিলেন, তাদের বেশিরভাগও ছিলেন অনভিজ্ঞ ও নতুন। এখন ছয় মাস পার এসে তিনি দেখেছেন, কোথায় কোথায় পরিবর্তন করা দরকার এবং সেভাবে পরিবর্তন করছেন।”
তথ্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের কারণ প্রকাশ পেলে অন্যরাও সতর্ক হবেন বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, “এই পরিবর্তনের মূল কারণটা যেটা আসবে বা প্রকাশ পাবে, সেটার ভিত্তিতে অন্যদের কাছেও বার্তা যাবে। নেতিবাচক কারণে পরিবর্তন হলে অন্য মন্ত্রীরাও সাবধান হবেন।” রাষ্ট্রপতি হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জায়গায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে মঈন খানের যাওয়াকে ‘যথার্থ’ বলেই মানছেন অধ্যাপক কাজী মাহবুব।
জোটসঙ্গী বিজেপির আন্দালিভ রহমান পার্থকে মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসার মাধ্যমে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে, সেটা এখনও স্পষ্ট না হওয়ার কথা তুলে ধরে এই বিশ্লেষক বলেন, “হয়ত তিনি আউটস্পোকেন হওয়ায় সরকারের পক্ষে বক্তব্য দিতে পারবেন এবং জনমত তৈরি করতে পারবেন।”
দলীয় কাজে জহির উদ্দিন স্বপনকে আরও বেশি পরিমাণে কাজে লাগানোর চিন্তা থেকে তাকে উপদেষ্টা করা হয়েছে, ধারণা এই বিশ্লেষকের।
সরকারে নতুন গতিবেগ দেওয়ার দেওয়ার এই পরিবর্তন আনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না যে, কারও অদক্ষতা বা ব্যর্থতার কারণে এই রদবদল করা হয়েছে বা সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কি-না। গুরুত্বপূর্ণ ছিল কাকে কোথায় কাজে লাগানো যায় সেই বিবেচনা।
“সামান্য কিছু পরিবর্তন এনে গতি বা মাত্রা বাড়ানো যায় কি-না, সেই চিন্তা করা হয়েছে। এই পুনর্গঠনের বড় রকমের প্রভাব সরকারে উপর পড়বে বলে মনে হয় না। দল এবং সরকারের প্রয়োজনে কিছু জায়গায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।”