কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে টিনের বেড়া দিয়ে সরকারি জমিতে (বাতিলকৃত প্লট) চলছে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণের কাজ। এসব স্থাপনা থেকে এককালীন সেলামী বাবদ প্রতি দোকান থেকে অগ্রিম মোটা অংকের টাকা নিয়েছে একটি চক্র।
উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জনসম্মুখে রাতারাতি গড়ে উঠা এসব স্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানাভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন স্থানীয় ও পরিবেশবাদীরা। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের নজরে আসলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মশিয়ুর রহমানকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।
সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কলাতলী পুলিশ বক্স থেকে ওসান প্যারাডাইস পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কের পাশে ১৫ ফুট উচ্চতার টিনের বেড়া। ইতিমধ্যে সেখানে পরিপাটি করে ১১ টি কাউন্টার ও ট্রাভেল এজেন্সি গড়ে উঠেছে। পাশে তিনটি চায়ের দোকান। সরকারি জায়গা গড়ে উঠা প্রতিষ্ঠানগুলো হল, বৈশাখী রেস্তোরাঁ, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ফরিদ ট্রাভেলস, বৈশাখী বাস কাউন্টার, স্টার ট্রাভেলস লি:, এস আই এন্টারপ্রাইজ, গ্রীণ সেন্টামার্টিন এক্সপ্রেস, বেঙ্গল পরিবহন, আইকন পরিবহন ও স্বপ্ন তরী। পাশেই চলছে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কাজ। ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল কর্মযজ্ঞ। ৮ জন শ্রমিক কাজ করছেন। ১৯ টি দোকানের মধ্যে ১০ টির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। নিয়োজিত শ্রমিকদের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা জানান, একজন মাঝির সাথে কন্ট্রাকে কাজ নিয়েছেন তারা। মাঝির মোবাইল নাম্বার চাইলে তারা সন্ধ্যার পরে আসলে তাঁকে (মাঝি) পাওয়া যাবে বলে জানান। এসময় ইউনিফর্ম পরে আসেন রাকিব নামের একজন নিরাপত্তা কর্মী। কথা হলে, তিনি জানান, সিকিউরিটি ইনচার্জ মান্নানের মাধ্যমে তিনি সেখানে চাকরি করেন। চাকরির ধরন জানতে চাইলে রাকিব বলেন, এই পুরো এলাকার দেখাশোনা আমি করি৷ এসব স্থাপনা নির্মাণ কে করছে? এমন প্রশ্নে তিনি কোন উত্তর দেননি। বের হয়ে চোখে পড়ে ঘেরাও দেওয়া টিনের মাঝখানে পরপর তিনটি সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা আছে, বিএস খতিয়ান নং-০১-এর ৩০ নম্বর প্লটটি (দাগ নম্বর ২০০০৩) নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন। উচ্চ আদালত ওই জায়গায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের নতুন স্থাপনা না তোলার জন্য ‘স্থিতাবস্থার’ (Status Quo) আদেশ দেন। কিন্তু আদালতের এই নির্দেশকে তোয়াক্কা না করেই ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখলের পাঁয়তারা চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে সেখানে নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। এরই মধ্যে নির্মাণাধীন দোকানগুলো মোটা অঙ্কের ‘সালামি’র বিনিময়ে বরাদ্দ দেওয়ার কথাও ছড়িয়ে পড়েছে এলাকায়। প্রতি দোকান থেকে ১২ লাখ টাকা ও মাসিক ভাড়া বাবদ ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায় এই তথ্য।
এলাকাবাসী জানান, একই প্লটের একাংশ দখল করে ইতিপূর্বে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রায় ২০টি দোকান গড়ে তোলা হয়েছিল, যা থেকে প্রায় কোটি টাকার সালামি ও নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে চক্রটি। গত বছরের ২০২৫ সালের ৮ মে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) কলাতলী ডলফিন মোড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছিল। কিন্তু, বৈশাখী রেস্তোরাঁ ‘মোহনা রেস্টুরেন্ট’সহ বেশ কিছু দোকান গুঁড়িয়ে দিলেও রহস্যজনকভাবে ওই বৈশাখী রেস্টুরেন্ট ও তৎসংলগ্ন অবৈধ অংশে কোনো হাত দেওয়া হয়নি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রসাদ প্যারাডাইসের মালিক ইউসুফ আবদুল্লার নামে বরাদ্দ দেওয়া ৩০ নম্বর প্লটটি বাতিল করেছিল সরকার। পরবর্তীতে সেই প্লট সরকারি ১ নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বৈশাখী রেস্টুরেন্টের মালিকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
কক্সবাজারের পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, আদালতের আদেশ অমান্য করে পর্যটন জোনের মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি দখলঘটনা আইনশৃঙ্খযবস্থার প্রতি চরম বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার সদর উপজেলা কমিশনার (ভূমি) মশিয়ুর রহমান দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, বিষয়টি জানতে পারার পরে, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় লোক পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, আদালতের আদেশের সুযোগ নিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে সরকারি খাস জমি দখল করার কোনো সুযোগ নেই। যদি বাতিলকৃত সরকারি প্লটে অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণের কাজ চলে থাকে, তবে অবিলম্বে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, বাতিলকৃত প্লটের স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি জানার পর সহকারী কমিশনারকে বলা হয়েছে। বাতিলকৃত প্লটে কোনো অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বেআইনি। এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।