জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, নদী দখল-দূষণ, জীববৈচিত্র্যের সংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য পৃথক ‘বাংলাদেশ উপকূল বোর্ড’ গঠনের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে উপকূলের মানুষের অধিকার, সংকট ও সম্ভাবনা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে ১২ নভেম্বর উপকূল দিবস পালনের দাবি জানানো হয়েছে। এ উপলক্ষে আগামী ১২ নভেম্বর ঢাকায় উপকূল দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের নদী, পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পৃথক উপকূল বোর্ড গঠনসহ কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
শনিবার কক্সবাজারে বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের (বিআরটিএন) আয়োজনে উপকূলীয় নদী সম্মেলন ২০২৬-এ বক্তারা এসব দাবি জানান। সম্মেলনে উপকূলীয় অঞ্চলের নদ-নদী, পরিবেশ-প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনজীবন ও সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়। উপকূলের বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী, গবেষক, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষকেরা উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ২১টি প্রভাব চিহ্নিত করেছেন। ২০ জন বাংলাদেশি গবেষক এসব প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন এবং সরকারের কাছে বিভিন্ন সুপারিশ জমা দিয়েছেন। উপকূলের নদী, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় এসব সুপারিশ বাস্তবায়নসহ কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
উপকূলীয় অঞ্চলের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টু। তিনি বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো বিবেচনায় না নিয়ে দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। উপকূলকে অবহেলায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তা পুরো দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করবে।
বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, টেকনাফের নাফ নদ থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কালিন্দী-রায়মঙ্গল সীমান্তবর্তী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই সম্ভাবনা সংকটে রূপ নিচ্ছে। উপকূলীয় নদী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মানুষের জীবন-জীবিকা নিরাপদ করতে পৃথক উপকূল কমিশন বা বোর্ড গঠন সময়ের দাবি।
সম্মেলনের প্রধান অতিথি কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোখতার আহমদ রেজু নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড নদীর জলজ পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। বিষাক্ত মাছ খাওয়ার কারণে জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকিতে পড়ছে। তিনি বাঁকখালী নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান।
সম্মেলনে বক্তারা উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য, নিরাপদ পানির সংকট, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং মানুষের জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, উপকূলের উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, নিরাপদ পানি, নদী ও পরিবেশ সুরক্ষাকে সমন্বিতভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নুরুজ্জামান সিপন। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির কক্সবাজার শাখার সভাপতি মাহমুদুল হাসান নোমান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন, সিনিয়র আইনজীবী রমিজ আহমদ, বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল ইসলাম মাহমুদ এবং যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুহেনা মোস্তফা কামাল।
সম্মেলনের মুক্ত আলোচনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নদী সংগঠক ও স্থানীয় নদীকর্মীরা অংশ নেন। তাঁরা নিজ নিজ এলাকার নদী, পরিবেশ ও উপকূলীয় জনজীবনের সংকট তুলে ধরেন এবং সুরক্ষায় সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নদী সংরক্ষণে কাজ করা প্রায় ৫০ জন প্রতিনিধি ও স্হানীয় পরিবেশকর্মী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নেন।