প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও বিদেশ যাওয়া ও ফেরত আসার পুরো প্রক্রিয়ায় তারা পদে পদে মানবিক মর্যাদাবঞ্চিত হচ্ছেন। কাজের যোগ্য সম্মান, ন্যায্য মজুরি এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ায় হওয়া অন্যায়-বিচারের প্রতিকার পাওয়া তাদের সাংবিধানিক অধিকার হলেও অনেক সময় তারা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাই অভিবাসন ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত জিএমসিকে ইউনিয়ন পরিষদের ১৪তম স্থায়ী কমিটি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় কক্সবাজার জেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে "অভিবাসন শাসনব্যবস্থা ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি" শিরোনামে এক গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন, ইউকে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এবং উন্নয়ন সংস্থা ইপসা-এর উদ্যোগে এবং 'দৈনিক কক্সবাজার'-এর সার্বিক সহযোগিতায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রথম সূচনা বক্তব্য রাখেন ইপসা'র পরিচালক মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম। তিনি নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতে এবং তৃণমূল পর্যায়ে অভিবাসীদের আইনি সুরক্ষায় ইপসা'র দীর্ঘদিনের কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেন এবং গোলটেবিল বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন।
এরপর স্বাগত বক্তব্য রাখেন 'দৈনিক কক্সবাজার'-এর পরিচালনা সম্পাদক মোহাম্মদ মুজিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, "প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দৈনিক কক্সবাজার সবসময় প্রবাসীদের সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরেছে এবং ভবিষ্যতেও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে এই অভিবাসীদের ন্যায্য দাবিগুলো পৌঁছে দিতে কাজ করে যাবে।"
বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন এবং "অভিবাসী অধিকার: ন্যায় বিচার ও বিকল্প সুরাহা" শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অভিবাসন খাত বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, "বর্তমান সরকারের পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় ন্যায়সঙ্গত ও সুষ্ঠু অভিবাসনের কথা বলা হলেও জাতীয় বাজেটে অভিবাসন খাতে বরাদ্দ খুবই নগণ্য। অভিবাসীদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো ন্যায়সঙ্গত ব্যয়ের পরিবর্তে উচ্চমূল্যে বিদেশ গমন, প্রতিশ্রুত কাজ বা বেতন না পাওয়া এবং শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হওয়া।"
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যয় বিশ্বে সর্বাধিক। এটি কমানোর জন্য ধাপে ধাপে অবৈধ অর্থ প্রদান বন্ধ করতে হবে এবং সকল খরচের সত্যিকার রসিদ প্রদান অভিবাসন অনুমোদনের পূর্বশর্ত হতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
গোলটেবিল বৈঠকে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডিন ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এবিএম আবু নোমান। তিনি বলেন, "আমাদের অভিবাসন আইন ২০১৩ এবং মানবপাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনেক শক্তিশালী হলেও এর বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। প্রবাসীদের আইনি সহায়তা আরও সহজলভ্য করতে হবে এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।"
বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক কক্সবাজার শাখার ম্যানেজার মোহাম্মদ নোমান প্রবাসীদের জন্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "প্রবাসীরা যাতে দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত না হন, সেজন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এই বিষয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে আরও ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন।"
ব্র্যাকের সেক্টর স্পেশালিষ্ট মং থি ওয়েং মানবপাচার প্রতিরোধ এবং বিদেশ ফেরত কর্মীদের সমাজে পুনরায় একত্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, "কক্সবাজারের মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় মানবপাচার একটি বড় সমস্যা। মানবপাচার প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশাসনের নজরদারি বাড়াতে হবে।"
এছাড়া বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন ও উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন কক্সবাজার জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক লিটন কান্তি চৌধুরী, রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধি আব্দুল মালেক, আইওএম-এর কক্সবাজার প্রতিনিধি মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, সিএমসির সদস্য খালেদা আক্তার, রামরু এর পরিচালক মেরিনা সুলতানা, উইটনেস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ সিদ্দিকী, ওয়ারবি ফাউন্ডেশনের পরিচালক জেসিয়া খাতুন, আইনজীবী বিশ্বজিত ভৌমিক, চৌফলদণ্ডি জিএমসি'র সদস্য মাস্টার সালেহ আহমেদ, ইপশার সহকারি পরিচালক জিশু বড়ুয়া।
তারা তাদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
গোলটেবিল বৈঠক থেকে উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশসমূহের মধ্যে রয়েছে, ১, অভিবাসন আইনের ক্রুটি দূর করে সমন্বয় করা, ২. বিদেশ গমনের পূর্বে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে বৈধ কাগজপত্র তৈরি করা, ৩. স্থানীয় সরকারের বিদ্যমান ১৩টি স্থায়ী কমিটির পাশাপাশি অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে (জিএমসি) ইউনিয়ন পরিষদের ১৪তম স্থায়ী কমিটি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান। ৪. বিএমইটি -এর সালিশ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সহজলভ্য করা। ৫. পাসপোর্ট, এনআইডি এবং জন্মনিবন্ধন তথ্যের ডিজিটাল সমন্বয় করা। ৫. রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের (দালাল) জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ৬. উপজেলা পর্যায়ে তথ্য, আইনি সহায়তা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস' চালু করা। ৭. অভিবাসন ও মানবপাচার মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা। ৮. এসব জনঅধিকারের বিষয়ে ব্যপক প্রচারণার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
অনুষ্ঠানে বক্তারা একমত হন যে, প্রবাসীদের ঘামে অর্জিত টাকায় দেশের অর্থনীতি সচল থাকে। তাই তাদের নিরাপদ অভিবাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সকল বেসরকারি সংস্থা, প্রশাসন ও সুশীল সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।
গোলটেবিল আলোচনার প্যানেল বক্তাদের আলোচনা শেষে ইপসা'র পরিচালক মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম ও 'দৈনিক কক্সবাজার'-এর পরিচালনা সম্পাদক মোহাম্মদ মুজিবুল ইসলাম এর সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।