বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে প্রতিদিন ভিড় করেন হাজারো পর্যটক। কিন্তু দুর্ঘটনা বা জরুরি অসুস্থতায় দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। সমুদ্রস্নানে স্রোতের টানে ভেসে যাওয়া কিংবা হঠাৎ অসুস্থ পর্যটকদের হাসপাতালে নিতে একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটিও দীর্ঘদিন ধরে অচল। জরুরি এই সেবা সংকটে উদ্বিগ্ন পর্যটক, পর্যটন ব্যবসায়ী ও লাইফ গার্ডরা।
প্রতিদিন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ভিড় করেন হাজারো পর্যটক। নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে বিশ্বের দীর্ঘতম এই সৈকত। তবে আনন্দের এই ভিড়েই লুকিয়ে থাকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সাঁতার না জানা, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া কিংবা সাগরের স্রোতে ভেসে যাওয়ার মতো ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
কিন্তু দুর্ঘটনার পর সেই জরুরি সেবাই এখন বড় সংকটে। কক্সবাজার সৈকতের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে আছে। অযত্নে নষ্ট হচ্ছে এর যন্ত্রাংশ। ফলে বিপদে পড়া পর্যটকদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থাও হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত। পর্যটকদের দাবি, বিশ্বের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
শাহরিয়ার সামিদ বলেন, “প্রতিদিন সমুদ্রসৈকতে হাজার হাজার, এমনকি লক্ষাধিক দর্শনার্থী আসেন। এখানে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষ ভ্রমণে আসেন। আমাদের মতো অনেক তরুণও আসেন, তবে সবার সাঁতার জানা থাকে না। ফলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এবং বাস্তবেও এমন ঘটনা ঘটছে। তাই দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সেখানে হাসপাতালে প্রেরণের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি নাকি বছর খানেক ধরে অকেজো। এটা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না।”
রবিউল ইসলাম বলেন, “আমরা পর্যটক হিসেবে প্রতিবছর কক্সবাজারে আসি। এখানে দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ পর্যটকের আগমন ঘটে, যার মাধ্যমে সরকারও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা ও সুযোগ-সুবিধা এখনও পর্যাপ্ত নয়। এখানে একটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে সেটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারকে আরও আধুনিক ও নিরাপদ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। বিশেষ করে কেউ আহত, অসুস্থ বা দুর্ঘটনার শিকার হলে যেন দ্রুত চিকিৎসা ও হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। একজন পর্যটক হিসেবে এটাই আমাদের দাবি।”
পর্যটন ব্যবসায়ীদের দাবি, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত সচল করা হোক অ্যাম্বুলেন্স সেবা।
হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, “সারা বছর কক্সবাজারে লক্ষ লক্ষ পর্যটকের সমাগম ঘটে। এসব পর্যটকের বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের দুর্ঘটনা ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আমার জানা মতে, একটি সংস্থার পক্ষ থেকে এখানে একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেটির সেবা বন্ধ রয়েছে। প্রথমদিকে এটি সামান্য ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকলেও পরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় অ্যাম্বুলেন্সটি আরও নষ্ট হয়ে গেছে।
কক্সবাজার থেকে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করে। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তা ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এই অ্যাম্বুলেন্সটি দ্রুত সচল করা প্রয়োজন। পর্যটকরা যেন দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার সময় দ্রুত চিকিৎসা নিতে পারেন, সে বিষয়ে প্রশাসনের সুদৃষ্টি দেওয়া জরুরি।”
এদিকে সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে কক্সবাজার সৈকতে পানিতে নেমে ৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এক হাজার ৫০ জনকে।
তাদের মতে, সৈকতে স্থায়ী মেডিকেল সেন্টার, সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স ও দ্রুত রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অনেক দুর্ঘটনায় বাঁচানো সম্ভব হবে মূল্যবান প্রাণ।
সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার প্রকল্প কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বালুকাময় সৈকতে পর্যটকদের জন্য কোনো স্থায়ী মেডিকেল সাব-সেন্টার নেই। ফলে কেউ পানিতে ডুবে গেলে বা অন্য কোনো জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়লে তাকে প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়।
এই রোগী পরিবহনের সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়মিত কার্যকর না থাকায় কিংবা অনেক সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় জরুরি মুহূর্তে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। আমরা দেখেছি, অনেক সময় উদ্ধার করার পরও রোগী জীবিত ছিলেন, কিন্তু হাসপাতালে নিতে নিতে তার মৃত্যু হয়েছে। এমনকি কেউ পানিতে না নেমেও হঠাৎ শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হলে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুবরণ করার ঘটনাও ঘটেছে।
তাই কক্সবাজার সৈকতে একটি স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি, যেখানে সার্বক্ষণিক জরুরি চিকিৎসাসেবা, বিশেষ করে পানিতে ডুবে যাওয়া (ড্রাউনিং) ও হৃদরোগের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত চিকিৎসক থাকবেন। পাশাপাশি একটি অ্যাম্বুলেন্স সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।
এছাড়া দ্রুত রোগী পরিবহনের জন্য বিচ বাইক, বিভিন্ন পয়েন্টে স্ট্রেচার এবং লাইফ গার্ডদের কাছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রাখা দরকার। এতে দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত রোগীকে উদ্ধার করে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা সম্ভব হবে।”
তবে অচল অ্যাম্বুলেন্স সচলের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসক বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে অর্থের ব্যবস্থা করে দ্রুতই অ্যাম্বুলেন্সটি মেরামত করা হবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “আমাদের যে অ্যাম্বুলেন্সটি রয়েছে, সেটি মেরামত করতে কিছুটা বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আমরা দ্রুত বিচ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কমিটির সঙ্গে আলোচনা করব। প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করে জরুরি ভিত্তিতে অ্যাম্বুলেন্সটি সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাতে কক্সবাজারে আগত পর্যটকরা কোনো দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে দ্রুত তাদের হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়, সেই সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।”
পর্যটনের অন্যতম প্রধান গন্তব্য কক্সবাজার। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সৌন্দর্য নয়, প্রয়োজন আধুনিক জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও বলছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।