মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
’কক্সবাজারে বিভিন্ন আদালতে ৬৫ জন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ’ শিরোনামে ০৭ আগস্ট দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় প্রথম পৃষ্টায় ছবিসহ প্রকাশিত সংবাদটি পড়ে জনগণ অবগত হয়েছেন যে কক্সবাজার জেলায় বিএনপি সরকারের আমলে নতুন করে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। ফলে ড.ইউনুছের অস্থায়ী উপদেষ্টা সরকারকর্তৃক নিযুক্ত আইন কর্মকর্তাদের নিয়োগ বাতিল হয়েছে। বিএনপির কয়েকজনসহ ভিন্ন দলের কয়েকজন আইনজীবীর নাম নতুন তালিকায় দেখা যাচ্ছে না।
১৯৮৫ সালের ১৫ জানুয়ারী চট্টগ্রাম জেলা থেকে পৃথক হয়ে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। জেলার প্রথম জেলা জজ আবদুর রউফ মোল্লা,প্রথম জিপি এডভোকেট আলহাজ্ব আবুল কালাম আজাদ,এলজিপি সিরাজুল ইসলাম। পিপি নিযুক্ত হন ফিরোজ আহমদ চৌধুরী ও আমি, প্রসেফর নুর আহমদ,আবুল বশর,মোঃ শাহজাহান মোট ৪জন এপিপি নিযুক্ত হন। ফিরোজ আহমদ চৌধুরী অবসরে গেলে ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে আমাকে পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ করা হয়। তখন জেলা ও দায়রা জজ ছিলেন এমএম রুহুল আমিন ( যিনি পরে সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতি হয়ের্ছিলেন)। কক্সবাজার মহকুমাকে জেলায় উন্নিত করায় এসপি,ডিসি ও জেলা ও দায়রা জজের অফিস-আদালতের অবকাঠামো ছিল না। মহকুমা পুলিশ অফিসারের কার্যালয় হয়ে যায় পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় শুরু করা হয় সমুদ্র পাড়ের রেস্ট হাউস এ ( সী বিচ রেস্ট হাউস)। মহকুমার মুন্সিফ আদালতকে জেলা ও দায়রা জজ আদালত করা হয়। পিপি,জিপির কোন অফিস ছিল না। কাছারী পাহাড়ে বর্তমান জেলা প্রশাসকের কার্যালয় নির্মিত হওয়ার পর আমি পিপি থাকা আমলে নিচ তলায় কোর্ট ইন্সপেক্টরের অফিসের পাশে কেইস ডাইরীসহ মামলা সংক্রান্ত সরকারী গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র রাখার জন্য একটি ছোট অফিস প্রাপ্ত হই। তবে আসবাবপত্র নিজে সংগ্রহ করেছিলাম।
সরকার পিপি,এপিপি,জিপি,এজিপি নিয়োগ দিলেও তাদের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে কোন নির্দেশনা বা প্রশিক্ষণ দেওয়া হত না। আমি পিপি হওয়ার পর আমার সিনিয়র সিআরপিসি বই এর লেখক ও পাকিস্তান আমলের পিপি চট্টগ্রামের এডভোকেট জহিরুল হক ও চট্টগ্রামের সাবেক পিপি আমিরুল কবির চৌধুরীর ( পরে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হয়েছিলেন) সাথে টেলিফোনে পরামর্শ নিয়ে কাজ করতাম। আমি পিপি নিযুক্ত হওয়ার পর পর আমাকে তৎকালীন জেলা জজ ডেকে তার চেম্বারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা এখনও মনে রেখেছি। তিনি বলেছিলেন, এপিপি হিসেবে আপনার মামলা পরিচালনা ও আইন বইসহ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করার অভ্যাস দেখে আমি তিনজন সাম্ভাব্য পিপির তালিকায় সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে আপনার নাম দিয়েছিলাম। আপনার পিতাও এই আদালতে উকালতি করতেন বিধায় সিনিয়র আইনজীবীদের আপনি পিতার মত শ্রদ্ধা করেন,করবেন তা স্বাভাবিক। কিন্তু তারা আপনার চেয়ে আইনকানুন বেশী জানেন বলে হীনমন্যতায় ভোগলে অসুবিধা হবে। আমি লক্ষ্য করেছি আপনি চট্টগ্রাম দায়রা জজ আদালতে জহিরুল হক সাহেবের সাথে থেকে দায়রা মামলা সংক্রান্ত আইনকানুন বেশী শিখেছেন,বেশী জানেন। আপনাকে সরকার বেতন/ভাতা দেবেন,তার বাইরে কোন অজুহাতেই আপনি আসামীপক্ষের টাকা নিতে পারবেন না। প্রতিপক্ষের নিকট থেকে ফিসের নামে টাকা নিলে তা হবে নাজায়েজ,হারাম,ঘুষ। আসামীপক্ষে দরখাস্ত দাখিল করার সময় আপনাকে কপি দিয়ে ’সিন’ করাবেন। কপি দেওয়ার সময় স্বেচ্ছায় টাকা দিলেও নিবেন না। টাকা ছাড়া আসামীদের দরখাস্তের কপি নেওয়া আপনার আইনী দায়িত্ব। কোন মামলায় সাক্ষ্য দিতে সাক্ষী আপনার কাছে আসলে কোন অজুহাতেই তাদের ফেরৎ দিবেন না। সাক্ষী ফেরৎ দিলে ভবিষ্যতে তারা আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসতে নিরুৎসাহিত হবেন। তাদের হাজিরা কোর্টে দাখিল করবেন, এটাও সততার অংশ। কারণ কোর্টই সাক্ষীদের হাজির হওয়ার জন্য সমন ইস্যু করেছেন। সাক্ষীকে ’টেস্ট’ করে যদি দেখেন তাকে আসামীর পক্ষে বশে করে এনেছেন তখন আপনি তাকে ’হোস্টাইল’ বা বৈরী ঘোষণা করে জেরা করতে পারেন। হাজিরা দিয়ে সাক্ষী আসামীর বশে চলে গিয়েছেন বিধায় রাষ্ট্রপক্ষে তার সাক্ষ্য নিবেন না উল্লেখ করেও দরখাস্ত দিতে পারেন। হাজির হওয়া সাক্ষীর সাক্ষ্য অপ্রয়োজনীয় মনে করলে হাজিরা দিয়ে তাকে আসামী পক্ষে জেরা করার জন্য ’টেন্ডার’ করতে পারেন। প্রয়োজনী সাক্ষীর হাজিরা না দিলে আসামীপক্ষ সাক্ষ্য আইনের বিধান অনুযায়ী ’এডভারস ইনফারেন্স’ পেতে পারেন। আদালত জনগণের ন্যায় বিচার চাওয়ার/পাওয়ার ও আশা-ভরসার পবিত্র আশ্রয়স্থল। আসামী,সাক্ষী,বাদী কাউকে আদালতে অসম্মান করা যাবে না,অশালীন ভাষায় কথা বলা বা বকাবকি ও গালাগালি করা যাবে না। কারণ তারা আদালতের মেহমানতূল্য। জেনেশুনে আদালতকে মিথ্যা কথা বলা যাবে না। প্রতিটি মামলায় কেইস ডাইরী,জুডিসিয়াল নথী ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র চার্জ গঠনের আগেই ভাল করে পড়ে আলাদা কাগজে বা খাতায় নোট করে প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। আপনার দায়িত্ব ’ছলে বলে কৌশলে’ যে কোনভাবে প্রত্যেক আসামীকে দন্ডিত করানো বা হাজতে প্রেরণ করানো নয়। বাদী যেমন ন্যায় বিচারপ্রার্থী,আসামীরদেরও নিরপেক্ষ, ন্যায় বিচার পাওয়ার আইনী অধিকার আছে। তাই ন্যায় বিচার করতে আদালতকে আইনানুগভাবে সাহায্য করাই সরকারী আইন কর্মকর্তা হিসেবে আপনার আইনী দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য।
ইদানিং আমি যখন আইনজীবী ও আইনজীবী সহকারীদের মুখে শুনি যে আপিল,রিভিশন,মিচ কেইস ফাইল করতে সরকারী আইন কর্মকর্তাকে কপি দিতে গেলে তিন শত টাকা অফিসে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তখন এম,এম রুহুল আমিন সাহেবের আমাকে দেওয়া উপদেশ স্মরণ করে বলতে ইচ্ছা হয় এইভাবে টাকা দিতে বাধ্য করা সম্পূর্ণ বেআইনী, অনৈতিক, নাজায়েজ, হারাম ও ঘুষ। অভিযোগ সত্য হয়ে থাকলে তা এখনই বন্ধ করা হউক। দেশে আগে থেকে চলমান ঘুষ,দুর্নীতি,চাঁদাবাজী বন্ধ করা বর্তমান সরকারের ঘোষিত নীতি। গত সরকারের আমলে নিযুক্ত ৬৫ জন আইন কর্মকর্তার মধ্যে একজনও মহিলা আইনজীবী না থাকায় আমি দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত অতিথি কলামে প্রতিবাদ করেছিলাম। এইবার এজিপি হিসেবে সদ্য প্রকাশিত আইন কর্মকর্তাদের তালিকায় দুইজন মহিলা ( এডভোকেট রাবেয়া সুলতানা ও এডভোকেট সানিয়া তাসনিম এ্যানি) আইনজীবীর নাম দেখে ভালো লাগলো। নবনিযুক্ত সকল আইন কর্মকর্তাদের প্রতি অভিনন্দন ও শুভকামনা রইলো।