সাপ্তাহিক ছুটিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকের ঢল। কয়েক কিলোমিটারজুড়ে উৎসবের আমেজ—নোনাজলে সমুদ্রস্নান আর বালুচরে পরিবার-পরিজন ও প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দে মেতেছেন ভ্রমণপিপাসুরা। তবে লাল পতাকার সতর্কতা উপেক্ষা করে অনেকেই নামছেন ঝুঁকিপূর্ণ সাগরে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় সতর্ক রয়েছে লাইফগার্ড কর্মীরা।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়- সাগরের বড় বড় ঢেউ, বালুচরে মানুষের উপচে পড়া ভিড় আর শিশুদের উচ্ছ্বাস-সব মিলিয়ে যেন উৎসবের আমেজ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকাল থেকেই পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। ঢেউয়ের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠেন কেউ, কেউ ব্যস্ত প্রিয়জনের সঙ্গে ছবি তুলতে। পরিবার নিয়ে আসা পর্যটকদের আনন্দও যেন বাঁধ মানছে না।
সমুদ্রস্নান, ঢেউয়ের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ আর সৈকতে ছবি তোলা-পরিবার-পরিজন ও প্রিয়জনের সঙ্গে এমন আনন্দঘন মুহূর্তই কাটাচ্ছেন পর্যটকরা।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “কক্সবাজারে এসে আমাদের খুবই ভালো লাগছে। আমরা অফিসের ১০ জন সহকর্মী একসঙ্গে ঢাকা থেকে ঘুরতে এসেছি। এখানে এসে পরিবেশটা দেখে খুবই আনন্দ লাগছে। সমুদ্রসৈকতে অনেক মানুষের সমাগম হয়েছে, সবাই আনন্দ করছে। সব মিলিয়ে আমাদের কাছে কক্সবাজার ভ্রমণটা খুবই উপভোগ্য ও আনন্দদায়ক মনে হচ্ছে।”
পর্যটক আল-আমিন বলেন, “কক্সবাজার সবসময়ই আমাদের কাছে একটি আকর্ষণীয় ভ্রমণস্থান। আমরা প্রতি বছরই চেষ্টা করি অন্তত একবার পরিবার নিয়ে এখানে আসতে। এই সময়ে পর্যটকের ভিড়ও অনেক বেশি। পাশাপাশি শরৎকালের সুন্দর আবহাওয়া ও মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে পারছি। সব মিলিয়ে কক্সবাজার এসে খুবই ভালো লাগছে।”
সায়েদুল আলম বলেন, “বাংলাদেশে বিনোদনের জায়গার কিছুটা অভাব রয়েছে। তাই কক্সবাজারকে আমরা অন্যতম প্রধান বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে দেখি। কাজের ব্যস্ততার মাঝে দুই-একদিন সময় পেলেই মানসিক প্রশান্তি ও বিনোদনের জন্য কক্সবাজারে ছুটে আসি।”
তাহমিনা নাসরিন বলেন, “ঘোড়ার পিঠে চড়ার মজাটাই আলাদা। তাই ঘোড়ায় চড়তে এসেছি, খুব ভালো লাগছে এবং বেশ আনন্দে সময় কাটছে। অনেক দিন পর কক্সবাজারে আসা। ছোটবেলায় একবার এসেছিলাম, এবার বড় হয়ে তিন ভাই-বোন একসঙ্গে এসেছি। সব মিলিয়ে সময়টা খুবই সুন্দর কাটছে।”
তবে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে ঝুঁকিও। সৈকতের বালিয়াড়িতে লাল পতাকা টাঙিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান সম্পর্কে সতর্ক করা হলেও অনেক পর্যটক তা উপেক্ষা করে নামছেন সাগরে নামছেন। তারপরও দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে লাইফ গার্ড কর্মীরা।
সি সেফ লাইফগার্ড সংস্থার সিনিয়র কর্মী মোহাম্মদ শুক্কুর বলেন, ছুটির দিনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে হাজারো পর্যটকের সমাগম হয়। বর্তমানে সমুদ্র বেশ উত্তাল এবং পানিতে প্রচুর গর্ত রয়েছে। এ কারণে পর্যটকদের সতর্ক করতে আমাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পয়েন্টে লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। পাশাপাশি মাইকিং করে এবং ব্যক্তিগতভাবে পর্যটকদের সমুদ্রে না নামার জন্য সতর্ক করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক পর্যটক সতর্কবার্তা ও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পানিতে নামছেন। বিশেষ করে যেসব স্থানে লাইফগার্ড সার্ভিস নেই, সেসব পয়েন্টে লাল পতাকা দেওয়া হয়েছে। তারপরও পর্যটকরা সেখানে গোসল করতে নামছেন। ফলে যারা লাইফগার্ডের সতর্কতা অমান্য করে পানিতে নামছেন, তাদেরই বিপদে পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
মোহাম্মদ শুক্কুর আরও বলেন, বর্তমানে তিনটি বিচে মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ একটি বিচেই অন্তত ২৭ জন করে লাইফগার্ড থাকা প্রয়োজন। সে হিসেবে তিনটি বিচে ১০০ জনেরও বেশি লাইফগার্ড দরকার। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের অনেকটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত আরও লাইফগার্ড নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে পর্যটকের ভিড়ে বেচাকেনায় জমজমাট সৈকতপাড়ের দোকানপাট। বাড়তি ব্যস্ততা দেখা গেছে ঘোড়াওয়ালা, বিচ বাইক ও জেটস্কি চালকদের মধ্যেও। পর্যটকদের আনাগোনায় বাড়ছে তাদের কর্মচাঞ্চল্য ও আয়-রোজগার।
জেট স্কি চালক সাদ্দাম হোসেন বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে আমাদের ব্যবসা ভালো চলছে। সামনে বর্ষা মৌসুম শেষ হলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছি। এতে আমাদের ব্যবসাও আরও ভালো হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি।”
পাল দোকানদার মো. কামাল বলেন, “বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার-এই তিন দিন পর্যটকের চাপ তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে এ সময় আমাদের বেচাকেনাও বেড়ে যায়। বিশেষ করে-মুক্তা ও ঝিনুকের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী, আচার, জুতা, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন পণ্যের বিক্রি এই তিন দিনে বেশি হয়।”
বামিজ আচার ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, “ছুটি কাটাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা কক্সবাজারে আসছেন। পর্যটকের ভিড় বাড়ায় আমাদের ব্যবসাও ভালো হচ্ছে, আলহামদুলিল্লাহ। সামনে পর্যটনের মৌসুম শুরু হলে ব্যবসা আরও ভালো হবে বলে আমরা আশা করছি।”
পর্যটকরা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি ঘুরে বেড়াচ্ছেন দীর্ঘ ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের একাধিক বিনোদন স্পটে।