কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের সীমানা প্রাচীরের বাইরে পরিত্যক্ত জায়গায় গড়ে তোলা ১৫-১৬ টি পানের বরজ উচ্ছেদ করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের রেঞ্জ অফিসার মনজুর আলমের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ১৬টি পানের বরজ গুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা। এ ঘটনায় পান চাষের সঙ্গে জড়িত ওই এলাকার অন্তত ৫০টি গরীব চাষি পরিবার কমপক্ষে ৪০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতিসাধন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পানচাষিদের অভিযোগ, ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করে আসছি। এরই ধারাবাহিকতায় জীবিকা নির্বাহের অংশ হিসেবে দুই যুগের বেশি সময় ধরে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ ভুইজ্জ্যা ডেপা এলাকার বগাছডি খালের তীরে (সাফারি পার্কের সীমানা প্রাচীরের বাইরে) পরিত্যক্ত জায়গায় পানের বরজ তৈরি করে চাষ করে আসছেন স্থানীয় গরীব ও ভূমিহীন অন্তত ৫০টি হিন্দু মুসলিম পরিবার।
দরিদ্র পান চাষি নিতাই দে, রতন দে, বৌদ্ধ দে, পলাশ দে সহ অনেকে দা্বি করেন, সাফারি পার্কের রেঞ্জ অফিসার মনজুর আলম পানের বরজ গুড়িয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন আগে আমাদের কাছ থেকে লোক পাঠিয়ে ঘুষ দাবি করে। কিন্তু আমরা তাঁর আব্দার মেটাতে পারিনি। এ অবস্থায় শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাত আনুমানিক তিনটার দিকে রেঞ্জ অফিসার মনজুর আলমের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে আমাদের পানের বরজ গুলো ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, পানের বরজগুলো এমনভাবে কেটে ফেলা হয়েছে যে গাছগুলো এখন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। শনিবার সকালে পরিচর্যার কাজ করতে গিয়ে পানের বরজ গুলো ভেঙে দেয়ার দৃশ্য দেখে ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের নির্বাক হয়ে পড়ে।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘ তিন দশক ধরে এই প্রান্তিক পরিবারগুলো এই চাষাবাদের ওপর ভরসা করেই বেঁচে ছিল। হিন্দু-মুসলিম মিলিয়ে ৫০ পরিবারের হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও রুজি-রোজগার জড়িয়ে ছিল এর সাথে। কোনো প্রকার পূর্ব নোটিশ বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে, এভাবে আয়ের একমাত্র উৎসটি কেটে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
যে পানের বরজ দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে তারা ঋণ নিয়েছিলেন, তা এখন মাটির সাথে মিশে গেছে। ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাদের মাথার ওপর ঋণের বোঝা এখন পাহাড়সম। এই অবস্থায় পরিবারগুলো আজ চরম মানবেতর ও দিশেহারা জীবনযাপন করছে। ঋণ শোধ করা তো দূরের কথা, পরিবারের জন্য দুমুঠো অন্ন জোগানোই এখন তাদের পক্ষে অসম্ভব।
তিনি কোনো ধরনের পূর্বতাগাদা বা নোটিশ ছাড়াই গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে পানের বরজগুলো ভেঙে ও গুটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে দরিদ্র পানচাষিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
ডুলাহাজারা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রিয়াজ উদ্দিন শিপু বলেন, কয়েকদিন আগে সাফারি পার্কের রেঞ্জ অফিসার মনজুর আলমকে অনুরোধ করেছিলেন, পানচাষের মৌসুম শেষ হলে দরিদ্র পানচাষিরা নিজেরাই বরজ সরিয়ে নেবে। পান বরজের জায়গা বনবিভাগের হলে তাঁরা ফেরত দেবে। কিন্তু আমার সেই অনুরোধ রাখা হয়নি। রেঞ্জ অফিসার মনজুর গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে পানের বরজ গুলো ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের অভিযোগ, সরকারি জমি রক্ষার নামে গভীর রাতে প্রশ্নবিদ্ধ অভিযান চালিয়ে দরিদ্র মানুষের জীবিকা ধ্বংস করা হয়েছে। তাদের দাবি, রেঞ্জ অফিসার মনজুর আলমের নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় পরিচালিত এ অভিযানের আগে চাষিদের সঙ্গে আলোচনা করা হলে আমার নিজেরাই বরজ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পান চাষী ও হতদরিদ্র পরিবার গুলোর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের রেঞ্জ অফিসার মনজুর আলমের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তিনি মোবাইল রিসিভ করেনি। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে বিষয়টি জানিয়ে তিনবার ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে এবিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত পানচাষি এবং চাষের সঙ্গে জড়িত হতদরিদ্র পরিবার গুলো এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এবিষয়ে চকরিয়া উপজেলা বন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, সাফারি পার্কের রেঞ্জ অফিসার কতৃক গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে পানের বরজ উচ্ছেদ করে দেয়ার বিষয়টি শুনেছি। এবিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।