সাগরে মাছের আনাগোনা কম, সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া-দুই সংকটে কক্সবাজারের জেলেরা। ছোট ট্রলারে কিছু সামুদ্রিক মাছ মিললেও কাঙ্খিত ইলিশের দেখা নেই। ফলে ঘাটে কমেছে মাছের সরবরাহ, বাড়ছে ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের লোকসান। তবে জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও ট্রলার মালিকদের আশা-আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জমে উঠবে ইলিশের মৌসুম।
সরেজমিনে দেখা যায়, কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে ভিড়েছে ছোট ছোট ট্রলার। তবে নেই গভীর সাগরে মাছ ধরা বড় ট্রলার। ছোট ট্রলারগুলো থেকে নামানো হচ্ছে লইট্টা, চিংড়ি, পোপা, ছুরি ও রূপচাঁদাসহ হরেক রকমের সামুদ্রিক মাছ।
জেলেরা বলছেন, ইলিশের দেখা না মিললেও উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় এক-দুই দিন জাল ফেলতেই কিছু সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ছে। সরবরাহ কম থাকায় মাছের দামও তুলনামূলক বেশি।
জেলে কামাল সিকদার বলেন, বর্তমানে ছোট ট্রলারগুলো সাধারণত এক থেকে দুই দিনের জন্য উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় মাছ শিকার করছে। সকালে সাগরে গিয়ে বিকেলে মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছে, আবার বিকেলে সাগরে গিয়ে পরদিন সকালে মাছ নিয়ে ফিরে আসছে।
তিনি বলেন, মাছের পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও বাজারে দাম কিছুটা বেশি। বর্তমানে এক ড্রাম মাছ ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জেলে রকিবুল ইসলাম বলেন, ছোট ট্রলারগুলোতে মূলত লইট্টা, চিংড়ি ও পোপা মাছ ধরা পড়ছে। ঘাটে চিংড়ি প্রতি কেজি ২০০ টাকা এবং লইট্টা ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
তিনি জানান, মাছের সরবরাহ কম থাকায় বাজারে দাম তুলনামূলক বেশি রয়েছে।
জেলে ইকবাল হোসেন বলেন, ছোট ট্রলারে করে ঘাটে আনা মাছ দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এরপর ড্রামভর্তি করে সেগুলো দ্রুত চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মাছের আকার ও মানভেদে এক ড্রাম লইট্টা, পোপা ও চিংড়ি ১৭ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে সরকারি ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে বড় ট্রলার সাগরে গেলেও বারবার বৈরী আবহাওয়া ও সতর্ক সংকেতে ফিরে আসতে হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, সাগরে ইলিশের তীব্র সংকট থাকায় চাহিদা অনুযায়ী মাছ মিলছে না। ফলে অনেক ট্রলার অলস পড়ে আছে, আর চলমান খরচে বাড়ছে লোকসান।
মৎস্য ব্যবসায়ী হারুন-উর-রশীদ বলেন, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে চাহিদা অনুযায়ী ইলিশ কিংবা অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। জেলেরা জানিয়েছেন, সমুদ্রে বিরূপ আবহাওয়া ও বাতাসের কারণে ইলিশ শিকার ব্যাহত হচ্ছে।
মৎস্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, সাগরে বর্তমানে ইলিশের দেখা মিলছে না বললেই চলে। পর্যাপ্ত ইলিশ না পাওয়ায় অনেক ট্রলার উপকূলে তুলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। এতে একের পর এক লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।
তিনি বলেন, “ইলিশ না থাকায় আয় নেই, অথচ খরচ চলছেই। ফলে ট্রলার মালিকদের লোকসানের বোঝা দিন দিন আরও বাড়ছে।”
মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, বর্তমানে বলতে গেলে সাগরে ইলিশ একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যান্য মাছ কিছুটা পাওয়া গেলেও, তা দিয়ে একটি ট্রলারের পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে যে পরিমাণ খরচ হয়, সেই খরচ বহন করা এখন নৌযান মালিকদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ কারণে অনেক ট্রলার বর্তমানে সাগরে যাওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা হারিয়েছে। একটি ট্রলার সমুদ্রে পাঠানোর জন্য যে মূলধন বা পুঁজি প্রয়োজন, সেটিও অনেক মালিকের কাছে নেই।
যেসব ট্রলার এখনো সাগরে যাচ্ছে, সেগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। একটি ট্রলারে মাত্র ১০–২৫টি ইলিশ মাছ পাওয়া যাচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এত অল্প ইলিশ দিয়ে একটি ট্রলার পরিচালনা করা কিংবা নৌযান মালিক ও মাছ ব্যবসায়ীদের খরচ তুলে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইলিশের এই সংকট জেলে, নৌযান মালিক এবং মাছ ব্যবসায়ী-সবার জন্যই বড় ধরনের আর্থিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে।
তবে ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ীদের আশা, বৈরী আবহাওয়া কেটে গেলে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইলিশের প্রকৃত মৌসুম শুরু হবে।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি শওকত ওসমান ফারুক বলেন, “বর্তমানে বৈরী আবহাওয়া ও বর্ষাকালের কারণে মাছ ধরায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে যাওয়ার পর ট্রলারগুলো দুই-এক দিন অবস্থান করতে না করতেই আবার বৈরী আবহাওয়ার সংকেত আসে। ফলে জেলেরা স্থায়ীভাবে জাল ফেলতে পারছেন না। এ কারণে ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও এখনো আশানুরূপ ইলিশ ধরা পড়েনি। তবে আমরা আশা করছি, আরও ১৫ থেকে ২০ দিন পর আবহাওয়া অনুকূলে এলে ইলিশের প্রকৃত মৌসুম শুরু হবে এবং তখন কাঙ্খিত পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়বে।”
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ মে থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত কেন্দ্রে এসেছে ১৩৪ টন ইলিশ এবং ৯৬৮ টন অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ।