মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
বিগত ১৯ জুন কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠান কক্সবাজার সরকারী গ্রন্থাগারের হল ঘরে সাহিত্য একাডেমীর নির্বাচিত সভাপতি বিশিষ্ট গবেষক, লেখক ও সাংবাদিক মুহাম্মদ নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সাংবাদিক আজাদ মনসুরের সঞ্চালনায় প্রচুর সাহিত্যমোদী নারী-পুরুষ, তরুণ তরুণী ও শিশুদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত রজতজয়ন্তী বা ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন দেশের খ্যাতিমান কবি, বাংলা কবিতার বিদগ্ধ স্বর, দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল হাই সিকদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সের মহাপরিচালক সিরাজুল ইসলাম ও বিশিষ্ট কলামিস্ট, সাবেক পিপি,কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। সভায় একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক কথাসাহিত্যক সোহেল ইকবাল কর্তৃক স্বাগত বক্তব্য রাখার পর একাডেমীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক কবি,অধ্যাপক দিলওয়ার চৌধুরীর পরিচালনায় সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে সম্মাননা স্বারক প্রদান করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে সাহিত্য সংগঠক,প্রাবন্ধিক,কবি এডভোকেট সুলতান আহমদ(মরণোত্তর),গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব কথা সাহিত্যিক,গীতিকার ও কবি ড. শাহেদ ইকবাল,অনুবাদক, প্রবীণ সাংবাদিক,সাহিত্য সংগঠক ও কবি রুহুল কাদের বাবুল, ’তুরে পুতুলের মত করে সাজিয়ে’ খ্যাত গানের রচয়িতা,,গীতিকার ও কবি ড. আবদুল্লাহ আল মামুন,প্রচ্ছদশিল্পী ও কবি খালিদ আহসান(মরণোত্তর),কক্সবাজারের প্রথম নারী কবি ও সংগঠক কবি হাসিনা চৌধুরী লিলি, শিক্ষাবিদ ও কবি জোবাইদা আব্বাস ঝিনুক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক,শিক্ষাবিদ,গবেষক ও কবি ড. মোহাম্মদ আলম চৌধুরী রয়েছেন। পুরস্কারপ্রাপ্তরা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। প্রয়াত কবি খালিদ আহসানের পক্ষে তার যোগ্য স্ত্রী পুরস্কার গ্রহন করেন এবং প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শুক্রবার একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদির মৃত্যুতে ও কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর প্রয়াত সদস্যদের সম্মান জানিয়ে ও স্মরণ করে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা ও তাদের আত্মার শান্তি কামণা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য দেন রামু ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুলের প্রিন্সিপাল লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ড. মো. আব্দুর রহিম, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও কবি আকতার উদ্দিন হেলালী, সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাংবাদিক জি এ এম আশেক উল্লাহ,কক্সবাজার ডায়াবেটিকস সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আবদুল কাইয়ুম, একাডেমীর সহ-সভাপতি,সাবেক শিক্ষা অফিসার ও ছড়াকার মোঃ নাছির উদ্দিন ও ঢাকা থেকে আগত অতিথি দৈনিক নিরপেক্ষ পত্রিকার সম্পাদক আতা উল্লাহ খান।
সাহিত্য এমন এক সুগন্ধি যা মানুষকে সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়। সাহিত্য হচ্ছে মনকে সজীব,সতেজ,সচল ও গ্রহনশীল রাখার এক শ্রেষ্ঠ উপায়। সাহিত্য হচ্ছে দেশ ও জাতির জীবন মানসের প্রতিফলন। সাহিত্য হচ্ছে সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখ পূর্ণ জীবনের দলিল বিশেষ। জাতির মনের কথার লিখিত রূপই হচ্ছে সাহিত্য। যে কোন সভ্যতার উৎকৃষ্ট ব্যারোমিটার হলো তার কবি, সাহিত্যিক, লেখকরা। সাহিত্য সেবকরা পরস্পরের পরমাত্মীয়। হিন্দু হোক, মুসলমান হোক,বৌদ্ধ হোক,খ্রিষ্টান হোক তারা কেউ পর নয়, সাহিত্যসেবীরা একে অপরের আপন জন। দেশের সবকিছুতে চরম রাজনীতিকরণ,দলীয়করণ প্রবণতাকে উপেক্ষা করে কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী তৃণমূল পর্যায়ে বিগত ২৫ বছর ধরে রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে বিবেক ও মস্তককে মুক্ত স্বাধীন রেখে সাহিত্য আন্দোলনের পতাকা নিয়ে সফলভাবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী কক্সবাজার জেলার কবি, সাহিত্যিক, লেখকদের লেখা কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, লোক সাহিত্য ইতিহাস, ইসলামিক লেখা শীর্ষক ১০৩টি বই, ৩০টি একাডেমীর মুখপ্রত্র সমুদ্র সংলাপ, শিশুদের নিয়ে কিশোর সংলাপ ২টি,স্কুল মাদারাসার শিশুদের নিয়ে প্রতিভা অন্বেষণে কর্মসূচী পালন করেছে এবং একাডেমীর বার্ষিক পিকনিককে কেন্দ্র করে একটি বিনোদনমূলক ’প্রমোদ সংলাপ’ প্রকাশ করেছে । একাডেমী এ যাবৎ জাতীয় দিবসসমূহ পালনের পাশাপাশি পাক্ষিক সাহিত্য সভার আয়োজন করেছে ৫৫০টি । জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক কবি-সাহিত্যিক-পন্ডিতদের পাশাপাশি একাডেমীর সম্মানিত সদস্য কবি-সাহিত্যিক,লেখকদের জীবনালেখ্য ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা সভার আয়োয়ন করেছে।
আমি কবি, সাহিত্যিক, সাহিত্য বিষয়ক লেখক নই। তবে দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকা প্রকাশ হওয়ার দিন থেকে প্রায় ৩৫ বছর ধরে ’অতিথি কলাম’ নামে দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় প্রতি সপ্তাহে একটি কলাম লিখে থাকি, যা আমার অভ্যাস বা নেশায় পরিণত হয়েছে। অতিথি কলাম নিয়ে সংকলন আকারে ঢাকার এক প্রকাশক বই প্রকাশ করেছেন তিনটি। আগে আমার আইন বই প্রকাশিত হয়েছে পাঁচটি। কিন্তু আমাকে লেখক হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী যা আমি কোন দিন কল্পনাও করি নাই। ৩২জন কবি, সাহিত্যিক,লেখকের লেখা নিয়ে আমাকে সম্মানিত করার জন্য ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে ’লেখক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর সংখ্যা’ নামে সমুদ্র সংলাপের একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছে। এতে কক্সবাজার জেলার সুপ্রীমকোর্টের প্রথম বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরীর লেখা, কক্সবাজার তৎকালীন মহকুমার প্রথম জেলা ও দায়রা জজ আবু বক্কর ছিদ্দিকীর লেখা, সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিমের লেখা ও ড. সফিউদ্দিন আহমদের লেখাও অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছিল। পেশাদার লেখক না হলেও কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধের কারণে একাডেমীর ডাকে সাড়া দিয়ে ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বা রজতজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত একাডেমীর মুখপত্র সমুদ্র সংলাপের বিশেষ সংখ্যার জন্য একটা কিছু লেখা আমার নৈতিক দায়িত্ব বিধায় একটা লেখা দিয়েছি ও আমাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে সম্মানিত করায় আমি আনন্দঘন রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছি।
এটা নিশ্চিত করে বলা যায় কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী উদ্যোগ না নিলে হয়তঃ স্থানীয় লেখকদের অনেক বই প্রকাশিত হয়ে পাঠকদের হাতে আসতো না। মরহুম অধ্যক্ষ মোস্তাক আহমদ, মরহুম কবি এডভোকেট আবুল কালাম আজাদ ও মরহুম কবি ডাক্তার কবির আহমদ বেঁচে থাকতেই তাঁদের সম্মানে কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী বিভিন্ন লেখকের লেখা নিয়ে সমুদ্র সংলাপের বিশেষ সংখ্যা বই আকারে প্রকাশ করে তাদের সম্মানিত করেছে। মৃত্যুর পর গুণী ব্যক্তিরা তাদের শোক সভায় কে কিভাবে তাদের প্রশংসা করে বক্তব্য দিলেন তা শুনার সুযোগ নাই। তাঁরা জীবিত অবস্থায় লিখিত আকারে বই এ তাদের সম্পর্কে কে কি লিখেছেন তা দেখে যেতে পেরেছেন। তা কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর প্রশংসাযোগ্য ও অনুকরণীয় উদ্যোগ ছিল বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। আরো প্রশংসনীয় হল, কেউ কোন দিন পরোক্ষভাবেও কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীতে রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প আনার চেষ্টা করেন নাই। বিগত ২৫ বছর ধরে কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীকে রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে রাখতে সফল হয়েছেন বিধায় একাডেমীর সকল সদস্যদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন রইলো ।
কোন লাভের আশায় নয়, দেশের বহুমুখী অনিশ্চয়তা,অশান্তি ও টেনশনের মধ্যেও সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা সভা ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে একটু মানসিক প্রশান্তির জন্য কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর সম্মানিত সদস্যরা নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ২৫ বছর ধরে সাহিত্যকর্মে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করে যাওয়ার জন্য সকল সদস্যদের প্রতি রইলো আন্তরিক মোবারকবাদ।
প্রধান অতিথি প্রখ্যাত কবি আব্দুল হাই সিকদার কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর উদ্যোগে মোট ১০৩টা বই প্রকাশিত হয়েছে জানতে পেরে উচ্ছাস ও সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী জেলা শহরে শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতি লালন-পালন,সৃজনশীল প্রকাশনা ও সাহিত্যিক পরিমন্ডল সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে অনন্য অবদান রাখায় ভুয়সী প্রশংসা করেন।