ফিচার ডেস্ক
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত পেরিয়ে দক্ষিণে এগোলে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। এক পাশে নীল জলরাশি, অন্য পাশে সবুজ পাহাড়। সেই পাহাড়ঘেরা বনভূমির ভেতরেই বিস্তৃত ইনানী জাতীয় উদ্যান। পর্যটকদের কাছে ইনানী মানেই সমুদ্র, পাথর আর সূর্যাস্তের সৌন্দর্য। কিন্তু এই পরিচিত দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে আরেকটি বিস্ময়কর জগৎ। যেখানে এখনো টিকে আছে বিরল ও বিপন্ন বহু বন্যপ্রাণী।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ইনানী জাতীয় উদ্যান এলাকায় ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে মেঘলা চিতা ও পশ্চিমা উল্লুকের মতো বিরল এবং সংকটাপন্ন প্রাণী। এই তথ্য ইনানীর বনাঞ্চল যে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার, সেটিই নতুন করে সামনে এনেছে।
বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাসের গবেষণার বরাতে বলা হয়েছে, ক্যামেরা ট্র্যাপ, লাইন ট্রানসেক্ট এবং প্রাণীর পদচিহ্ন ও অন্যান্য পরোক্ষ আলামত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে গবেষণাটি শুধু প্রাণী গণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বনাঞ্চলের বৃক্ষরাজি, আশপাশের জনবসতি এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ওই এলাকার সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
ইনানীর ভৌগোলিক অবস্থানই একে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। পাহাড়ি বন ও উপকূলীয় পরিবেশের সংযোগস্থলে গড়ে ওঠা এই বনাঞ্চল প্রায় সাত হাজার ৮৫ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত। ২০১৯ সালে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এলাকাটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে। এরপর থেকে বনটির জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা ও সংরক্ষণ নিয়ে আগ্রহ বাড়লেও বাস্তব চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।
বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি যেমন আশার খবর, তেমনি বনাঞ্চলের ওপর বাড়তে থাকা মানবচাপ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। বসতি সম্প্রসারণ, বনজ সম্পদের ওপর মানুষের নির্ভরতা, শিকার, চলাচল এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড বনের স্বাভাবিক পরিবেশকে ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে প্রাণীদের আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো বনাঞ্চলে মেঘলা চিতা বা উল্লুকের মতো প্রাণীর উপস্থিতি শুধু একটি প্রজাতির অস্তিত্বের খবর নয়। বরং তা সেই বনের সামগ্রিক পরিবেশগত সুস্থতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কারণ এসব প্রাণীর টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত বন, পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ আবাসস্থল এবং মানুষের সীমিত হস্তক্ষেপ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, দেশের বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এখনো জনবল, অর্থ বরাদ্দ এবং ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তদারকি ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলগুলো দীর্ঘমেয়াদে আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ইনানীর বন শুধু বন্যপ্রাণীর আশ্রয় নয়, এটি কক্সবাজারের পরিবেশগত ভারসাম্যেরও অংশ। পাহাড়, ঝিরি, গাছপালা, পোকামাকড়, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং আশপাশের মানুষের জীবনযাপন সব মিলিয়েই এই বাস্তুতন্ত্র। এর একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রভাব পড়ে পুরো ব্যবস্থায়।
তাই গবেষণায় ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতি পাওয়া যেমন আনন্দের খবর, তেমনি এটি একটি সতর্কবার্তাও। যে বন এখনো এত বৈচিত্র্যময় প্রাণীকে আশ্রয় দিয়ে আছে, সেই বনকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত গবেষণা, কার্যকর নজরদারি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ উদ্যোগ।
ইনানীর সৌন্দর্য শুধু পর্যটকের চোখে দেখা সবুজ পাহাড় কিংবা সমুদ্রের ঢেউয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এই অরণ্যের গভীরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের এক মূল্যবান অংশ। সেই সম্পদ রক্ষা করা এখন শুধু বন বিভাগের দায়িত্ব নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জাতীয় দায়িত্বও।