সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে অনুরোধ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বলেন, অতীতের সংসদগুলোতে মানুষের চরিত্র হননের জন্য বিপুল সময় ব্যয় করা হয়েছে। বর্তমান সংসদ যেন কারও চরিত্র হননের কেন্দ্রে পরিণত না হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও এ দেশের সংসদ ও সংসদীয় রাজনীতি খুব কম সময় কার্যকর ছিল। বেশীর ভাগ সময় ফ্যাসিজমের কবলে পড়ে এটি ছিল অনেকটা ডামি সংসদ। বিরোধীদলীয় নেতা ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ ও ১৯৯০ সালে নিহত ব্যক্তিদেরসহ ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করেন ও আহত ব্যক্তিদের সুস্থতা কামনা করেন। তিনি নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালকে অভিনন্দন জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন স্পিকার সরকারী দল ও বিরোধী দলকে আলাদা চোখে দেখবেন না। খুব সুন্দর আশা জাগানিয়া বক্তব্য।
রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের ভাষণের প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা লাল রঙের প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে শ্লোগান দিয়ে ওয়াকআউট করেন। সংসদের বাইরে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করাসহ তিন দফা দাবীতে প্ল্যাকার্ড হাতে এনসিপির নেতা-কর্মীরা মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচী পালন করেন। পরের দিন সংবাদপত্রে সচিত্র সংবাদগুলো দেখে ও পড়ে জনগণ পক্ষে বিপক্ষে বিভিন্ন মন্তব্য করছেন। অনেকে ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া ও বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোষ্ট দিচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি অধিবেশনকক্ষে প্রবেশ করার সময় বিরোধী দলের সদস্যদের কেউ কেউ নিজ আসনে বসে ছিলেন এবং উচ্চস্বরে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে বিরোধীদলীয় চীফ হুইফ নাহিদ ইসলাম দাঁড়িয়ে বলেন,’কিলার ইন দ্য পার্লামেন্ট’। এ সময় তিনি নো নো বলে প্রতিবাদ জানান। যদিও গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের কাছেই অন্তর্বতী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরু হওয়ার আগে বিরোধী দলের সদস্যরা নজিরবিহীনভাবে হাতে লাল রঙের প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে প্রতিবাদ করেন। এক পর্যায়ে সংসদ সদস্য এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ’কিলার চুপ্পু’ ’বয়কট চুপ্পু’ বলে শ্লোগান দেন। হইচইয়ের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি স্পিকারের অনুরোধে ভাষণ দিতে দাড়াঁলে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ’আপনি রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। আপনি ফ্যাসিবাদের দোসরের ভূমিকা পালন করেছেন’। এ সময় বিরোধীদলের সদস্যরা ’ফ্যাসিবাদের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান,স্বৈরাচারের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান,ফ্যাসিবাদ আর গণতন্ত্র একসাথে চলে না’ বলে শ্লোগান দেন। মোঃ সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন লোক হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনি ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ পদ থেকে অবসর গ্রহন করেন এবং ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ছিলেন। ২০২৪ সালের আমিডামি নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার সরকারকে তিনি শপথবাক্য পাঠ করান। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড.ইউনুসের অস্থায়ী সরকারের শপথ করান। তিনি বর্তমান বিপুল ভোটে বিজয়ী বিএনপি সরকারকেও শপথবাক্য পাঠ করান। সেনাবাহিনী প্রধান,প্রধান নির্বাচন কমিশনার,সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে তিনিই নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি উক্ত তিন সরকারের আমলেই ভাষণ দিয়েছেন। যখন যে সরকার ছিল প্রতিষ্ঠিত রীতি অনুযায়ী তাদের লিখিত ভাষণই তিনি পাঠ করেছেন। তাতে সরকারের বক্তব্যই প্রকাশ পেয়েছে, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত মতামত নয়। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে দেশের নিম্নআদালতসমূহে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবেও তিনি তার উপর ন্যস্থ আইনী ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র। সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে তার কোন কাজ করার জন্য বা না করার জন্য জবাবদিহি করতে হবে না বা কোন ফৌজদারী আদালতে মামলা করা বা পরোয়ানা ইস্যু করা যাবে না। কেবলমাত্র রাষ্ট্রপতিকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। দেশে আর কেউ আইনের উর্ধ্বে নন। রাষ্ট্রপতি পদটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক।
পর পর তিনটি সরকারই এই রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে শপথ নিয়েছেন। তিনি কি কাউকে তার কাছ থেকে শপথ নেওয়ার জন্য অনুরোধ বা আহ্বান করেছিলেন? দীর্ঘদিন পর অবাধ,অংশগ্রহনমূলক,শান্তিপূর্ণ,সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রবেশের সময় সম্মান দেখিয়ে না দাড়াঁনো,তাকে ’কিলার’, ’দোসর’ বলে পবিত্র সংসদে বাহির থেকে তৈরী করে আনা লাল রঙয়ের প্ল্যাকার্ড হাতে শ্লোগান দেওয়া কি চরিত্র হনন নয়? চরিত্র হননের সংজ্ঞা কি? জাতীয় সংগীতকে ও রাষ্ট্রপতিকে অসম্মান করা কি রাষ্ট্রকে অসম্মান করা,স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা নয়? সংসদের বাইরে লাগাতার চরিত্র হনন করে বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ মির্জা আব্বাসকে মৃত্যুর মূখে ঠেলে দেওয়া কি ইনসাফের লক্ষণ? প্রধান উপদেষ্টা ড.ই্উনুস এর অস্থায়ী উপদেষ্টা সরকারের আমলে তথাকথিত ’কিলার’,’গাদ্দার’, ’ফ্যাসিবাদের দোসর’ রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন কর্তৃক স্বাক্ষরিত ও জারীকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশ ও গণভোট আদেশ ইত্যাদিগুলো কি এই সংসদে পাশ করে আইনে রূপান্তর করা হবে? নাকি একই অভিযোগে ভাষণ বর্জন করার মত প্রত্যাখান করা হবে? রাষ্ট্রপতিকে অসম্মান করা প্রসঙ্গে ফেসবুকে একজন নাগরিকের মন্তব্য খুব ভাইরাল হয়েছে। একজন পিতার শত দোষ, অক্ষমতা থাকলেও পিতাকে কখনও সুসন্তানরা অসম্মান করতে পারেন না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন,জাতীয় সংসদকে তিনি সব যুক্তি,তর্ক এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চান। সংসদের নবনির্বাচিত স্পিকার খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর(অব) হাফিজ উদ্দিন আহমদ,প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান,বিরোধীদলীয় নেতা শফিক আহমদ ও সকল সংসদ সদস্যদের প্রতি শুভকামনা রইলো।