আসিফ মুনীর, অভিবাসন বিশেষজ্ঞ
প্রবাসী কর্মী বা অভিবাসী শ্রমিকের প্রসঙ্গ আসলেই নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে অনেকেই এক নিঃশ্বাসে বলে ওঠেন, "তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড।" কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিদেশ যাওয়া ও দেশে ফেরত আসার পুরো প্রক্রিয়ায় এই 'অর্থযন্ত্র' নারী-পুরুষেরা পদে পদে মানবিক মর্যাদাবঞ্চিত হচ্ছেন। কাজের যোগ্য সম্মান, ন্যায্য মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ায় হওয়া অন্যায়-বিচারের প্রতিকার পাওয়া তাদের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার। অথচ বেশিরভাগ সময়ই তারা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত।
বর্তমান সরকারের পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় ন্যায়সঙ্গত ও সুষ্ঠু অভিবাসনের কথা বলা হলেও, সাম্প্রতিক জাতীয় বাজেটে অভিবাসন খাতে বরাদ্দ খুবই নগণ্য। দীর্ঘদিনের চলমান সংকট নিরসনে সরকারের কিছু প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। অভিবাসীদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো ন্যায়সঙ্গত ব্যয়ের পরিবর্তে উচ্চমূল্যে বিদেশ গমন করতে বাধ্য হওয়া, প্রতিশ্রুত কাজ বা বেতন না পাওয়া এবং শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হওয়া। এর প্রতিকারের জন্য অভিবাসন আইন, নীতি, বিধি ও দিকনির্দেশনা থাকলেও তা সম্পূর্ণরূপে কার্যকরী নয়।
আমাদের দেশের অভিবাসন ব্যয় বিশ্বে সর্বাধিক। এই ব্যয়কে যুক্তিসঙ্গত করতে হলে দেশ থেকে প্রবাসের কর্মস্থল পর্যন্ত ধাপে ধাপে অবৈধ অর্থ প্রদান বন্ধ করতে হবে। সকল খরচের সত্যিকার রসিদ প্রদর্শন অভিবাসন অনুমোদনের পূর্বশর্ত হতে হবে। শুধু রিক্রুটিং এজেন্সি বা স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের মধ্য দিয়ে অভিবাসীদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সরকারি ও বেসরকারি সকল স্তরে স্বচ্ছতা, সততা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
অভিবাসীদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য সরকারি প্রয়াসের পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে গঠিত 'অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি' বা জিএমসি (GMC) একটি অত্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ। স্থানীয় সরকারের বিদ্যমান ১৩টি স্থায়ী কমিটির পাশাপাশি জিএমসি-কে ইউনিয়ন পরিষদের ১৪তম স্থায়ী কমিটি হিসেবে আঞ্চলিক ক্ষেত্রেপ্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া গেলে তৃণমূল পর্যায়ে প্রবাসীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে।
নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, আইনের প্রয়োগ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (ADR) কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সাথে পাসপোর্ট, এনআইডি এবং জন্মনিবন্ধন তথ্যের ডিজিটাল সমন্বয় করা এবং উপজেলা পর্যায়ে আইনি সহায়তার জন্য 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস' চালু করা এখন সময়ের দাবি।