যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যেই ইরান তাদের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মুজতাবা খামেনিকে তার উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি অগ্রাহ্য করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। কারণ, ট্রাম্প এর আগে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মুজতাবা নতুন নেতা হিসাবে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মত দিয়েছিলেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মুজতাবাকে এভাবে সর্বোচ্চ নেতা বানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর বার্তাই দিয়েছে ইরান। আর তা হল, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে পিছু হটবে না, বরং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।
মুজতাবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে নিয়োগ এটাই প্রমাণ করে যে, ইরানকে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করার যে চেষ্টা ট্রাম্প চালিয়েছিলেন, তা এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
তাছাড়া, মুজতাবাকে নিয়োগের মধ্য দিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থায় কট্টরপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হল এবং সংস্কারপন্থি বা মধ্যপন্থিরা কোণঠাসা হয়ে পড়ল।
এ পদক্ষেপ যুদ্ধ সহসাই বন্ধ হওয়ার পথ রুদ্ধ করল বলেই মনে করা হচ্ছে, বরং এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ আরও তীব্রতর হতে পারে এবং এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মুজতাবার নিয়োগের পরপরই রেভল্যুশনারি গার্ড ও ইরানি সেনাবাহিনী নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। মুজতবার অধীনে আরও শক্তিশালী প্রতিরোধের অঙ্গীকার করেছে তারা।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট’-এর ঊর্ধ্বতন ফেলো অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, “মোজতবাকে ক্ষমতায় আনা আসলে একই পুরোনো কৌশলের পুনরাবৃত্তি।”
ভাতাঙ্কা আরও বলেন, “এত বড় পরিসরের সামরিক অভিযান চালিয়ে, এত ঝুঁকি নিয়ে শেষ পর্যন্ত ৮৬ বছর বয়সী একজন মানুষকে (আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি) হত্যা করা, তারপর সেই জায়গায় তারই কট্টরপন্থি ছেলেকে বসতে দেখা- যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের অপমান।”
ইরানে জটিল, ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতাই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ। তিনি ইরানের পররাষ্ট্রনীতি ও পারমাণবিক কর্মসূচিসহ সব বিষয়ে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টকে নির্দেশনা দেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন,কট্টরপন্থি ধর্মীয় নেতা মুজতাবা খামেনিকে নিয়োগ করা হল এমন এক সময়ে যখন তার ব্যক্তিগত জীবনও যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানে বাবা আলি খামেনির পাশাপাশি তিনি মা, স্ত্রী ও এক সন্তানকেও হারিয়েছেন।
তাকে নির্বাচিত করার মধ্য দিয়ে একটি বার্তা স্পষ্ট। আর তা হল: ইরানের নেতারা নিজেদের শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করতে কোনও আপস করবে না। সংঘর্ষ, প্রতিশোধ ও কষ্ট সহ্য করা ছাড়া তারা সামনে আর কোনও পথ দেখছে না।
ইরানের অভ্যন্তরীন সূত্রমতে, জনগণের অসন্তোষ এবং চলমান সংঘাতের কারণে মুজতাবা খামেনি অভ্যন্তরীন ও বহির্বিশ্ব থেকে বড় চাপের মুখে পড়তে পারেন। তবু তিনি দ্রুত নিজের ক্ষমতা পোক্ত করার দিকে এগোবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
এর অর্থ হবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ক্ষমতার আরও বিস্তার, কঠোর অভ্যন্তরীন নিয়ন্ত্রণ এবং ভিন্নমত দমনে ব্যাপক দমন-পীড়ন।
তেহরানের ঘনিষ্ঠ এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “বিশ্ব তার বাবার আমলকে অনুভব করবে। মুজতাবাকে এখন কঠোর হাতেই দেশ চালাতে হবে... এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও অভ্যন্তরীনভাবে চরম দমন-পীড়ন চলবে।”
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অভ্যন্তরীন অস্থিরতার পর এই অবস্থান নেওয়া হল। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সেই জনবিক্ষোভ যুদ্ধ শুরুর আগেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রটিকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
এমন অবস্থায় ধসে পড়া অর্থনীতি, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার মানের পতন এবং ক্রমবর্ধমান দারিদ্র মোকাবেলার সঙ্গে লড়াই করে আসা ইরানে একইসঙ্গে কঠোর দমননীতিতে মানুষের ক্ষোভও বেড়েছিল।
এখন ইরানে যুদ্ধকালীন শাসন ব্যবস্থায় সে চাপগুলো আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সামনে কঠিন দিন:
মুজতাবার অধীনে সামনে কঠিন দিন অপেক্ষা করছে। মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এক ইরানি সূত্র বলেছেন, এখন অভ্যন্তরীন নিয়ন্ত্রণ হবে অনেক বেশি কঠোর, চাপ বাড়বে বহুগুণ এবং বিদেশের মাটিতে ইরানের অবস্থান হবে আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও শত্রুতাপূর্ণ।
‘মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট’-এর সিনিয়র ফেলো পল সালেম বলেন, মুজতাবা এমন কোনও ব্যক্তিত্ব নন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনও চুক্তিতে আসবেন বা কূটনৈতিকভাবে কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
সালেম বলেন, “এখন উঠে আসা কারো পক্ষেই আপস করা সম্ভব হবে না। এটি একটি চরম মুহূর্তে নেওয়া চরমপন্থি সিদ্ধান্ত।”
ইরানের আলেমদের দৃষ্টিতে যাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মহা শয়তান’ হিসেবে অভিহিত করেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ খামেনি হত্যাকাণ্ড তাকে তাদের কাছে ‘শহীদি’ মর্যাদায় উন্নীত করেছে।
আলেমরা নিহত এই নেতাকে একজন বীর হিসেবে চিত্রায়িত করছেন এবং তার তুলনা করছেন ইমাম হোসেনের সঙ্গে, যিনি শিয়া মতবাদে ত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক এবং ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আয়ার বলেন, “মুজতাবা তার বাবার চেয়েও খারাপ এবং অনেক বেশি কট্টরপন্থি।” তিনি আরও বলেন যে, মুজতাবা ছিলেন রেভল্যুশনারি গার্ডের পছন্দের প্রার্থী এবং তাকে এখন অনেক প্রতিশোধ নিতে হবে।”
তবে এই হিসাব-নিকাশের ঝুঁকিও রয়েছে। ইসরায়েল সতর্ক করে বলেছে যে, খামেনির যে কোনো উত্তরসূরিই তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সামরিক নেতৃত্ব এবং শাসকগোষ্ঠীর এলিট শ্রেণীকে নির্মূল না করা পর্যন্ত এই যুদ্ধ শেষ হবে না।
নতুন নেতা সংস্কারপন্থিদের বিরোধী:
৫৬ বছর বয়সী প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা মুজতাবা দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমাদের সঙ্গে সমঝোতার প্রবক্তা সংস্কারপন্থি গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতা করে আসছেন।
জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা এবং রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)- যারা ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সঙ্গে মুজতাবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাকে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মুজতাবা তার বাবার শাসনামলে ইরানের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে প্রভাব বিস্তার করেছেন। তিনি মূলত ‘ছোট সর্বোচ্চ নেতা’ হিসেবে কাজ করেছেন।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযান তীব্র হওয়ার সময়ে ক্ষমতায় মুজতাবার উত্থান হল। ইরানের জ্বালানি মজুত এবং অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চলছে। আবার ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। সব মিলে সংঘাত বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
মুজতাবা কোম শহরের সেমিনারিতে রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতার কাছে পড়াশোনা করেছেন এবং ধর্মীয় নেতা হিসাবে মর্যাদাসম্পন্ন হুজ্জাতুল ইসলাম খেতাব পেয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে মুজতাবার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। অভিযোগ ছিল, কোনও নির্বাচিত বা সরকারি পদে না থাকলেও মুজতাবা সর্বোচ্চ নেতার পক্ষে সরকারিভাবে প্রতিনিধিত্ব করেন।
উপসাগরীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক সরকারের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে ধারণা আছে এমন এক সূত্র বলেছেন, মুজতাবার নিয়োগ “ট্রাম্প ও ওয়াশিংটনকে এই স্পষ্ট বার্তাই দিচ্ছে যে, ইরান কোনও অবস্থাতেই পিছু হটবে না, তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।”
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট’-এর ঊর্ধ্বতন ফেলো পল সালেম ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিকে ১৯৯১ সালে সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলের ইরাক বা ২০১২ সালে বাশার আল–আসাদের শাসনামলের সিরিয়া পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
কয়েক বছর যুদ্ধ এবং বিচ্ছিন্নতার পরও সেসব দেশে সরকার টিকে ছিল, তবে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। সালেম বলেন, “তারা (ইরান) আরও কট্টরপন্থার দিকে এগোচ্ছে। দেশের ভেতরে পরিস্থিতি ভয়াবহ এবং খুবই অস্থিতিশীল।”