মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম
আশির দশকের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে একটা রেওয়াজ শুরু হয়েছিল তরুণ শিক্ষার্থীরা মিলে ক্লাব করা এবং ক্লাবের মাধ্যমে সমাজের কিছু কল্যাণমূলক কাজ করা। পাশাপাশি বৃক্ষরোপন, গ্রামের রাস্তা নির্মাণ, পূণ:নির্মাণ এবং রাস্তার সংস্কার কাজও করা হতো। নিখাদ সমাজ কল্যাণমূলক কাজ বলতে যা বোঝায় সেসব কাজ তখন খুব বেশি করা হতো এসব ক্লাবের মাধ্যমে। বলা যায় ক্লাবের সদস্যদের কাজ ছিল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। রক্তদানের মতো সামাজিক ও মানবহিতৈষি কাজকে তখনও কুসংস্কার ও একটি ধর্মবিরোধী কাজ বলেই মনে করতো সমাজ। সে সময় রক্তদান বিষয়টিকে জনপ্রিয় করার জন্য ক্লাবগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাল্য বিবাহ ও যৌতুক প্রথা পরিণত হয় নিয়মে। এ ধরনের এক নাজুক সময়ে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড উপজেলার মহাদেবপুর গ্রামে মো. আরিফুর রহমান নামে কলেজ পড়ুয়া একজন তরুণের নেতৃত্বেআন্তর্জাতিকযুববর্ষ১৯৮৫ সালের ২০ মে তারিখে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ”ইয়ং পাওয়ার” নামক একটি ক্লাব। সচরাচর যুব সংগঠন বা ইয়ুথ ক্লাবের ধ্যান-ধারণা থেকে বের হয়ে বৈশ্বিক যুব উন্নয়ন ভাবনাকে সামনে রেখে এই সংগঠন গঠন করা হয়। ৩নভেম্বর১৯৭৮সালে জাতিসংঘসাধারণ অধিবেশনে (রেজুলেশননম্বর৩৩/৭)১৯৮১-১৯৯০সালকে “যুবদশক” এবং১৯৮৫সালকে “আন্তর্জাতিক যুব বর্ষ” ঘোষণাকরাহয়।
মাদকের ছোবল থেকে এলাকার তরুণ ও ছাত্রদের সচেতন করার পাশাপাশি বৃক্ষ রোপন, বাল্যবিবাহ রোধ, রক্তদান কর্মসুচিকে জনপ্রিয় করা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে তরুণদের সৃজনশীলতার বিকাশের মাধ্যমে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য”ইয়ং পাওয়ার”বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহন করে।যেই কার্যক্রমগুলো সীতাকুন্ড ছাড়িয়ে পাশ্ববর্তী এলাকা পাহাড়তলী ও মিরসরাইতে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় যুবদেরকে বৈশ্বিক উন্নয়ন ধারণার সাথে পরিচিত করাও ছিলো এই সংগঠনের অন্যতম উদ্দশ্যে। যে কারণে ইপসা’র শুরুর দিকে ইন্টারন্যশনাল ভলান্টিয়ার এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিদেশী যুব স্বেচ্ছাসেবকরা এখানে এসে ইপসা’র যুব সদস্যদের সাথে কাজ করতো এবং ইপসা’র যুব সদস্যরাও বিদেশে গিয়ে তাদের সাথে কাজ করতো। দেশের যুবদের সাথে বৈশ্বিক পর্যায়ে একটা যোগাযোগ তৈরী হওয়ার অভিপ্রায় থেকে মো. আরিফুর রহমান “আন্তর্জাতিক যুব বর্ষ ১৯৮৫” মাথায় রেখে ইপসা প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল একটি সুপার সাইক্লোন বৃহত্তর চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে৪ লক্ষাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেন এবং জনমানুষের অনেক বেশি সম্পদহানি হয়। এই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর উদ্ধার, ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কার্যক্রমে ইয়ং পাওয়ার ক্লাবের সদস্যরা প্রথম দিন থেকে নেতৃত্ব দিয়ে বড় ধরনের উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করে। দীর্ঘমেয়াদী পূর্ণবাসন কার্যক্রমের পাশাপাশি সংগঠনটি এতদঞ্চলে সমাজ উন্নয়ন ও সমাজ কল্যাণমূলক কার্যক্রম শুরু করে। এই সব কার্যক্রমে একাই নেতৃত্ব দিয়ে মো. আরিফুর রহমান বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপক পরিচিত লাভ করেন এবং দেশে কর্মরত সকল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের কাছে‘ইয়ং পাওয়ার’ সুনাম অর্জন করে, সে সঙ্গে ব্যাপক পরিচিতি পায়। এরই মধ্যে মো. আরিফুর রহমান একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কক্সবাজার অঞ্চলে বিশেষ করে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া এলাকায় কাজ করার সুযোগ পান। যার পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ধার, ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নে দক্ষতা অর্জন করেন। এই সময়ে তিনি ইয়ং পাওয়ার ক্লাবের অর্বতৈনিক প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সারাদিন তিনি উক্ত আন্তর্জাতিক সংস্থার কাজ করতেন এবং রাতের বেলা ও বন্ধের পুরোটা সময় তিনি নিজ সংগঠনের জন্য ব্যয় করতেন। শুধু তাই নয়, তিনি বেতনের অর্ধেকের বেশি টাকা ইয়ং পাওয়ারের তহবিলে দিয়ে দিতেন।
বড় পরিসরে কাজ করার অভিপ্রায় থেকে ১৯৯২ সালের জুন মাসে বার্ষিক সাধারণ সভায় ইয়ং পাওয়ার ক্লাবের নাম পরিবর্তন করে ”ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল এ্যাকশন (ইপসা) করা হয়। ১৯৯৫ সালে ইপসা এনজিও বিষয়ক ব্যুরো’র নিবন্ধন লাভ করে এবং পুরোদমে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা এনজিও হিসেবে বৃহত্তর চট্টগ্রামে সমাজ উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ড. মো: আরিফুর রহমানের যোগ্য নেতৃত্ব ও দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনার কারণে ১৯৯৯ সাল থেকে ইপসা সবগুলো কার্যক্রমকে অধিকারভিত্তিক কার্যক্রমে রাপান্তর করে, ইপসা’র প্রধান কার্যালয় চ্টগ্রাম সিটি এলাকায় স্থানান্তর করা হয় এবং বড় পরিসরে কাজ শুরু করে।
বাংলাদেশেরউন্নয়নঅঙ্গনেএমনকিছুপ্রতিষ্ঠানরয়েছে, যাদেরইতিহাসকোনোএককসংগঠনেরইতিহাসনয়; একজনমানুষেরস্বপ্ন, দর্শনওআজীবন স্বপ্ন-সাধনারজীবন্তপ্রতিচ্ছবি।ইপসাঠিকতেমনইএকটিনাম, যারপ্রতিটিপদচিহ্নেরসাথেগভীরভাবেজড়িয়েআছেনএরপ্রতিষ্ঠাতাওপ্রধাননির্বাহীড. মো.আরিফুররহমান।ইপসাকেআলাদাকরেভাবাযেমনকঠিন, তেমনিড. মো.আরিফুররহমানেরসামাজিকইতিবাচকউন্নয়নভাবনাকেওইপসারবাইরেকল্পনাকরাপ্রায়অসম্ভব। তৃণমূল থেকে বৈশ্বিক বা গ্লোবাল কার্যক্রমের সঙ্গে কীভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে সংযুক্ত করা যায়, তিনি শুরু থেকেই বিষয়টি চিন্তা করতেন। এখনও তিনি তাঁর উন্নয়ন ভাবনায় আগামী এক দশক পরের চ্যালেঞ্জ, সুযোগ, চাহিদা, বৈশ্বিক উন্নয়ন ধারণা ওদৃষ্টিভঙ্গী কীহবেবাহতেপারেতার সঙ্গে যুক্ত করে বর্তমানকে ভাবেন। স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমকে কীভাবে বৈশ্বিকভাবে লিংক করা যায় (Think globally, act locally) এই চিন্তা ও ধারণাটি তিনি সবসময় পোষণ করেন।
ইপসারপ্রতিটিঅর্জনেরপেছনেড. মো.আরিফুররহমানেরদূরদর্শীনেতৃত্বওমানবিকদৃষ্টিভঙ্গিরছাপস্পষ্টভাবেদৃশ্যমান।শিক্ষা,স্বাস্থ্য,অর্থনৈতিকক্ষমতায়ন, জলবায়ুপরিবর্তনমোকাবিলা, মানবাধিকারসুরক্ষা, সুশাসন, দুর্যোগঝুঁকিহ্রাস, প্রতিবন্ধীব্যক্তিদেরঅধিকারপ্রতিষ্ঠা, মানবিকসাড়াদান, টেকসইউন্নয়নলক্ষ্যমাত্রা (SDG) বাস্তবায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন কৌশল পত্র (পিআরএসপি) প্রণয়নে চট্টগ্রাম থেকে নেতৃত্ব ওয়াকিংবাপ্রান্তিকজনগোষ্ঠীরক্ষমতায়নপ্রতিটিক্ষেত্রেইতিনিশুধুমাত্রএকজনপ্রশাসনিকপ্রধানহিসেবেইনন;একজনমানবিকসহযোদ্ধাহিসেবেকাজকরেচলেছেন।
চট্টগ্রামেরপ্রথমসরকারিঅনুমোদনপ্রাপ্তকমিউনিটিরেডিও“রেডিওসাগরগিরিএফএম৯৯.২”প্রতিষ্ঠারপেছনেওছিলতাঁরসুদূরপ্রসারীচিন্তা।তিনিবিশ্বাসকরতেন, মানুষেরকণ্ঠস্বরকেশক্তিশালীনাকরলেপ্রকৃতউন্নয়নসম্ভবনয়।তাইইপসারমাধ্যমেতিনিএমনএকটিপ্ল্যাটফর্মগড়েতুলেছেন, যেখানেসাধারণমানুষেরগল্প, সংকটওসম্ভাবনাসমাজেরসামনেউঠেআসতেপেরেছে। পাশাপাশি কক্সবাজার এলাকায় অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক (এফডিএমএন), শরণার্থী ও ক্ষতিগ্রস্থ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অবস্থা, অবস্থান, সংকট, সম্ভাবনা এবং মানবিক বিষয়গুলো তুলে ধরার জন্য “পালংয়ের হতা” অনলাইন প্লাটফরম পরিচালনা করছেন যা এখন কক্সবাজার এলাকায় জনপ্রিয় অনলাইন (অডিও এবং ভিডি কনটেন্ট) প্লাটফরম হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
ড. মো.আরিফুররহমানেরব্যক্তিগতমানবিকগুণাবলিইমূলতইপসারসাংগঠনিকসংস্কৃতিকেনির্মাণকরেছে।তাঁরকাছেউন্নয়নকখনোকেবলপ্রকল্পবাপরিসংখ্যানছিলনা; উন্নয়নছিলমানুষেরমর্যাদা, অধিকারওসম্ভাবনাকেপ্রতিষ্ঠিতকরারএকটিঅবিরামপ্রয়াস।এইকারণেইইপসাআজশুধুমাত্রএকটিএনজিওনয়, এটিএকটিমানবিকদর্শনেরপ্রতীক।
আন্তর্জাতিকঅঙ্গনেইপসারযেসাফল্যওস্বীকৃতি, তারপ্রতিটিধাপেড.মো.আরিফুররহমানেরদীর্ঘদিনেরঅধ্যবসায়ওকৌশলগতনেতৃত্বজড়িয়েআছে।জাতিসংঘেরবিভিন্নফোরামেঅংশগ্রহণথেকেশুরুকরেবৈশ্বিকউন্নয়নআলোচনায়সক্রিয়উপস্থিতি-সবখানেইতিনিবাংলাদেশেরপ্রতিনিধিত্বকরেছেনঅত্যন্তমর্যাদারসঙ্গে।তাঁরনেতৃত্বেইইপসাস্থানীয়অভিজ্ঞতাকেআন্তর্জাতিকপর্যায়েতুলেধরতেসক্ষমহয়েছেএবংসামাজিকউন্নয়নেরসফলমডেলহিসেবেইপসাকেসুপরিচিতকরতেপেরেছেন।
পাশাপাশিইপসাগণপ্রজাতন্ত্রীবাংলাদেশসরকারেরউন্নয়নপ্রতিষ্ঠানপল্লীকর্ম-সহায়কফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)’রসহযোগিসংস্থাহিসাবেবৃহত্তরচট্টগ্রামেবিভিন্নসমাজউন্নয়ন, দারিদ্র্যবিমোচনএবংঅর্থনৈতিকক্ষমতায়নকার্যক্রমএবংঅর্থমন্ত্রণালয়েরআর্থিকপ্রতিষ্ঠানবিভাগেরএকটিস্ব-শাসিতপ্রতিষ্ঠানবাংলাদেশএনজিওফাউন্ডেশন (বিএনএফ)’রপ্রতিষ্ঠাকালথেকেসহযোগিসংস্থাহিসেবেসামাজিকওমানবিকউন্নয়নমূলকবিভিন্নকার্যক্রমবাস্তবায়নকরছে।ইপসাজাতিসংঘেরঅর্থনৈতিকওসামাজিকপরিষদ ”United Nations Economic and Social Council (UN ECOSOC)” এরকনসালটেটিভস্ট্যাটাসপ্রাপ্তএকটিস্থায়ীত্বশীলউন্নয়নেরজন্যসংগঠন। এই অর্জনগুলো মূল ভিত্তি স্থাপন করেন ড. মো. আরিফুর রহমান এবং এগুলো তাঁর দূরদর্শী চিন্তাভাবনার ফসল।
তাইইপসাহলোড. মোঃআরিফুররহমানেরস্বপ্নেরসামাজিকরূপআরড.মো.আরিফুররহমানহলেনইপসারপ্রাণশক্তি।প্রতিষ্ঠানেরপ্রতিটিসাফল্যযেমনতাঁরনেতৃত্বকেসমৃদ্ধকরেছে, তেমনিতাঁরমানবিকদর্শনইপসাকেদিয়েছেএকটিস্বতন্ত্রপরিচয়।৪১বছরেরএইদীর্ঘ উন্নয় অগ্রযাত্রাকেবলসময়েরহিসাবনয়; এটিএকটিআদর্শ, একটিদায়বদ্ধতাএবংমানুষেরপাশেদাঁড়ানোরঅবিচলঅঙ্গীকারেরইতিহাস।ইপসাওড. মো.আরিফুররহমানএকেঅপরেরপরিপূরকহয়েবাংলাদেশেরউন্নয়নঅঙ্গনেযেদৃষ্টান্তস্থাপনকরেছেন, তাআগামীপ্রজন্মেরজন্যএকঅনন্যঅনুপ্রেরণাহয়েথাকবে এবং আমরা যারা ইপসা’তে কর্মরত আছি, আমরাও ড. মো.আরিফুররহমান সাথে উন্নয়ন সারথী হতে পেরে গর্ববোধ করি এবং আমাদের এই উন্নয়ন কার্যক্রমকে উপভোগ করি।
ইপসা’র ৪১ বছরেরএই স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দেওয়ার উন্নয়নজয়যাত্রাআরওদীর্ঘহোক, সাথে ড. মো.আরিফুর রহমানের মানবিক নেতৃত্বে ইপসা আগামী দিনেও সামাজিক ইতিবাচক পরিবর্তন ও মানবিক সমাজ গঠনের পথ দেখাবে এই প্রত্যাশাই করছি।
লেখক : উপ-পরিচালক ও আঞ্চলিক প্রধান, ইপসা।