স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মাদক কারবারিদের প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হবে না। কারণ প্রকাশ্যে তালিকা প্রকাশ করলে তা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং ত্রুটি দেখা দিতে পারে। তাই অত্যন্ত পেশাদারভাবে তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথম নিজ জেলা কক্সবাজার সফরে এসে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় যোগ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার বেলা সাড়ে ১১ টায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে টানা ২ ঘন্টা সভা শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সব ঘটনাকে “মব” হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। তার মতে, অনেক ঘটনা বিচ্ছিন্ন অপরাধ, যেগুলো নির্দিষ্ট অপরাধের সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে। কেউ কাউকে আটক করে নির্যাতন করলে সেটি মব নয়, বরং একটি নির্ধারিত অপরাধ যার আলাদা সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিভাগ রয়েছে। তবে সড়কে কোনো ধরনের মব পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে বলেও জানান তিনি। মব সংস্কৃতি যাতে বাংলাদেশে আর বিস্তার লাভ করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। গতকাল রাতে চট্টগ্রাম এলাকায় যৌথভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সরকার কোনো সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজ বা সংঘবদ্ধ অপরাধীকে আইনের বাইরে থাকতে দেবে না; সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে জনগণের জন্য স্বস্তিকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং সারা দেশে সুশাসন বজায় রাখতে এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
এক প্রশ্নের উত্তরে হাদী হত্যা মামলার দুই আসামি ভারতে আটকের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে যাতে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা যায়। এ বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হবে। সৈকতে থাকা সব ধরনের অবৈধ ও অস্থায়ী স্থাপনা এক সপ্তাহের মধ্যে অপসারণ করা হবে। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে এবং নবগঠিত বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ কাজে স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল সার্বিক সহযোগিতা করবেন বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দেশের গর্ব এবং বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হিসেবে এটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। এজন্য সৈকত এলাকায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ময়লা-আবর্জনা অপসারণ এবং পর্যটকদের জন্য কোনো ধরনের অসুবিধা সৃষ্টি করে এমন কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের লক্ষ্যে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি। পুলিশ প্রশাসনের নেতৃত্বে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
মাদক ও জুয়া, বিশেষ করে অনলাইন জুয়া বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, কক্সবাজারের উখিয়া–টেকনাফ সড়কসহ সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার বন্ধ করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ কাজে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি যৌথভাবে কাজ করবে।
ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জনবল দেওয়া হবে এবং শহরে ব্যাটারিচালিত টমটম ও অন্যান্য অযান্ত্রিক যানবাহনের সংখ্যা আর বাড়তে দেওয়া হবে না। লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রেও কঠোরতা আরোপ করা হবে। নির্ধারিত সংখ্যার বেশি যানবাহন চলতে দেওয়া হবে না এবং একটি লাইসেন্সের অধীনে একাধিক যানবাহন পরিচালনা করলে সেই লাইসেন্স বাতিল করা হবে। ধীরে ধীরে অচল হয়ে যাওয়া যানবাহনের সংখ্যা আর নতুন করে পূরণ না করে কমিয়ে আনা হবে।
তিনি আরও বলেন, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যাতে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সরকার সতর্ক থাকবে। সভায় গৃহীত অন্যান্য সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতায় কক্সবাজারে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নসহ সার্বিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
এসময় সভায় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, শাহজাহান চৌধুরী, আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার উপস্থিত ছিলেন।